আজ ১২ ফেব্রুয়ারি চলছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ। হুইলচেয়ারে করে সকালে সবার আগে কেন্দ্রে এসেও ভোট দিতে পারছিলেন না বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারী খুরশিদা আক্তার (২৯)। তার ভোট কক্ষ ভবনের তিনতলায়। শারীরিক অক্ষমতার কারণে উঠতে পারছিলেন না খুরশিদা। ভবনে প্রতিবন্ধীদের জন্য নেই বিশেষ কোনো সুবিধাও। এমনকি ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকেও তাকে ওপরে উঠতে কোনো সহযোগিতা করা হচ্ছিল না। তবে ভোট না দিয়ে কেন্দ্র ছাড়তে চাননি খুরশিদা।
অবশেষে বাধ্য হয়ে তার বৃদ্ধা মা আসমানি আক্তার মেয়েকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে তিন তলায় ওঠেন। সেখানে অন্য সবার মতোই ভোট দেন খুরশিদা। ভোট দেওয়ার পর তার চোখেমুখে দেখা যায় খুশির ঝিলিক।
ভোট দেওয়ার পর খুরশিদা জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভোট দিয়েছি ভাই। নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়া আমার দায়িত্ব। আমি প্রতিবন্ধী হতে পারি, কিন্তু অন্যদের মতো আমারও তো এক ভোট; একই রকম মূল্য।’ পরে আবার মায়ের কোলে চড়ে তিনতলা থেকে নিচে নামে খুরশিদা।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর বাড্ডার আলাতুন্নেছা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।
এর আগে সকাল ৭টা ১০ মিনিটে কেন্দ্রের সামনে আসেন খুরশিদা আক্তার ও তার মা আসমানি আক্তার। ভোটের লাইনে হুইলচেয়ারে বসে সবার আগে ছিলেন তিনি। কেন্দ্রের গেট খোলার পর ভেতরে প্রবেশ করেন। কিন্তু জানতে পারেন তাদের ভোট এবার তিনতলায়।
আরও পড়ুন:দুই ঘণ্টায়ও ভোট দিতে পারেননি হুইলচেয়ারে কেন্দ্রে আসা খুরশিদা
সিঁড়ি ভেঙে উঠতে না পেরে বাধ্য হয়ে নিচে হুইলচেয়ারে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেন খুরশিদা। তবে নিয়ম না থাকায় নিচে তার জন্য ব্যালট, সিল আনা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার। অবশেষে বেলা ১১টার দিকে তাকে কোলে করে ওপরে নিয়ে যেতে বাধ্য হন বৃদ্ধা মা।
এদিকে, কেন্দ্র থেকে নেমে আবারও হুইলচেয়ারে চড়ে বাসায় ফেরেন খুরশিদা। তবে মেয়ের ভোট দেওয়াতে কোলে করে তিনতলায় ওঠা-নামা করতে হাঁফিয়ে ওঠেন মা আসমানি আক্তার। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার বয়স হয়ে গেছে প্রায় ৬০ বছর। নিজেই সিঁড়িতে উঠতে পারি না। সেখানে মেয়েকে নিয়ে উঠতে জানডা বারাই গেছে।’
ভোট দিতে অনড় মেয়ে খুরশিদাকে নিয়ে গর্ববোধ করেন মা আসমানি। বলেন, ‘এবার দিয়ে তিনবার ও ভোট দিলো। সবাই বলে প্রতিবন্ধী মানুষ, ভোট দেওয়ার কি দরকার? কিন্তু ও বলে আমি প্রতিবন্ধী হলেও তো দেশের নাগরিক। ওর কারণে আমিও ভোট দিতে এসেছি। ও না আসলে আমিও আসতাম না।’
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মেয়ে খুরশিদা আক্তারকে নিয়ে দক্ষিণ বাড্ডায় ভাড়া বাসায় থাকেন আসমানি আক্তার। খুব কষ্টে চলে তাদের সংসার।
আসমানি বলেন, ‘আমাগো গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরে। কিন্তু প্রায় ১৮-২০ বছর হলো ঢাকায় থাকি। ওর বাপে ঢাকায় রিকশা চালাতো। আমি ঘর চালাইতাম। কিন্তু ঢাকায় আসার পরপরই ওর বাপ মারা যায়। খুরশিদার তখন বয়স ছিল ১০-১১ বছর। জন্ম থেকেই তো মেয়েটা ওইরকম (বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন)। আর কোনো ছাওয়াল-মেয়ে নেই। ওরে নিয়্যাই বেঁচে আছি।’
খুরশিদা বলেন, ‘আমি লেখাপড়া কিছুটা শিখেছি। প্রতিবন্ধী স্কুলে পড়েছি। আর আমরাই শক্তি নামে একটা প্রতিবন্ধী সংস্থার সদস্য। সেখান থেকে নিজের অধিকার আদায়ের শিক্ষাটা পেয়েছি। যত বাধাই আসুক, আমি এবং আমার মতো যারা আছেন, তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করে যাবো।’
আলাতুন্নেছা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মোহাম্মদ বরকত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি অনেক পরে জেনেছি। আমি জানার পরপরই কী ব্যবস্থা করা যায়, তা নিয়ে কাজ করেছি। নিয়ম না থাকায় নিচে তার জন্য ব্যালট ও সিল পাঠানো সম্ভব হয়নি। পরে একজন নারী আনসার সদস্যকে সহায়তা করতে বলা হয়েছিল। তবে ওই ভোটারের মা নিজেই কোলে করে তাকে ওপরে নিয়ে এসেছেন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়ম মেনেই গোপন বুথে পাঠিয়ে তার ভোটগ্রহণ করা হয়েছে।’
এদিকে, আলাতুন্নেছা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুটি পর্যবেক্ষক দল কেন্দ্রে এসে খুরশিদাকে দেখতে পান। দুটি দলের সদস্যরাই তার সঙ্গে কথা বলেন। সমস্যা ও তা নিরসনে কর্মকর্তাদের পদক্ষেপ জানতে চান। এরমধ্যে একটি দল তার ভোটগ্রহণের দৃশ্য কেন্দ্রে অবস্থান করে পর্যবেক্ষণ করেন। তারা তাকে সহায়তাও করেন।
ঢাকার ভোটকেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই বহুতল। অথচ সেখানে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের ওঠা-নামার ব্যবস্থা নেই। তাদের সহযোগিতা করার কোনো লোকও নেই। অথচ তাদেরকে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। বিষয়টি খুবই অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন বিদেশি পর্যবেক্ষকরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি পর্যবেক্ষক দলের সদস্য রবার্ট মুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকায় এ ধরনের বহুতল ভবনে বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্র। এ ধরনের ভোটকেন্দ্রের কক্ষে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এবং বয়স্কদের যেতে অসুবিধা হচ্ছে। তাদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থাও নেই। এটা হতাশাজনক। তবে এ ধরনের সমস্যায় পড়া ভোটারদের ভোটদানে আগ্রহ অনুপ্রেরণামূলক।’
এএএইচ/এসএনআর/এএসএম