ফিচার

রোমিও-জুলিয়েট থেকে শাহজাহান-মমতাজ, ইতিহাসের করুণ ভালোবাসা

ইতিহাসে ভালোবাসার গল্প যেমন অসংখ্য, তেমনি আছে এমন কিছু প্রেমকাহিনি যেগুলো শুনলে বুকের ভেতর কেমন হাহাকার জেগে ওঠে। ভালোবাসা দিবস মানেই যেখানে গোলাপ, প্রস্তাব আর আনন্দের গল্প, সেখানে কিছু প্রেম আছে যা শেষ হয়েছে অশ্রুতে, বিচ্ছেদে কিংবা মৃত্যুর মর্মান্তিক ছোঁয়ায়। এসব করুণ প্রেমকাহিনি শুধু ব্যক্তিগত নয়, কখনো বদলে দিয়েছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, এমনকি সভ্যতার আবেগের ভাষাও।

চলুন ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ ভালোবাসার গল্পগুলোর কয়েকটি নিয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

রোমিও-জুলিয়েট: চিরবিচ্ছেদের প্রতীকবিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে করুণ প্রেমকাহিনি বলতে প্রথমেই মনে পড়ে এই নাটকের কথা, যার স্রষ্টা উইলিয়াম শেক্সপিয়র। ভেরোনার দুই শত্রু পরিবার মন্টেগু ও ক্যাপুলেট। সেই দুই পরিবারের সন্তান রোমিও ও জুলিয়েট একে অপরের প্রেমে পড়লেও তাদের সম্পর্ক ছিল নিষিদ্ধ।

পরিবারের দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি এবং ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সব মিলিয়ে এই প্রেমকাহিনি শেষ হয় আত্মহত্যায়। রোমিও মনে করেন জুলিয়েট মারা গেছে, তাই বিষ পান করেন। জুলিয়েট জেগে উঠে রোমিওর মৃতদেহ দেখে নিজেও ছুরি চালান নিজের বুকে। এই গল্প শুধু প্রেমের নয়, বরং দেখায় ঘৃণা কীভাবে ভালোবাসাকে হত্যা করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ট্র্যাজেডি প্রেমের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক প্রতীক হয়ে আছে। বাস্তবিক বা সত্য ঘটনা না হলেও নাটকের এই করুণ দৃশ্য প্রেমের ইতিহাসে উদাহরণ হয়ে আছে।

শাহজাহান-মমতাজ: সমাধির ভেতরে বন্দি প্রেমমোঘল সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী মমতাজ মহলকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, তার মৃত্যুর পর পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত সমাধি নির্মাণ করেন তাজমহল।

মমতাজ ১৪তম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। ইতিহাস বলে, মৃত্যুর আগে তিনি শাহজাহানের কাছে চারটি প্রতিশ্রুতি চান তার সন্তানদের ভালো রাখা, অন্য বিয়ে না করা, তাকে স্মরণীয় করে রাখা এবং এমন কিছু নির্মাণ করা যাতে বিশ্ব তাদের প্রেম মনে রাখে। শাহজাহান সেই প্রতিশ্রুতি রাখেন, কিন্তু তার জীবনের শেষ সময় কাটে কারাবাসে, নিজের তৈরি সমাধির দিকে তাকিয়ে। এক অর্থে তিনি জীবন্ত থেকেও ছিলেন এক প্রেমের বন্দি।

টাইটানিক: ডুবে যাওয়া ভালোবাসাপরিচালক জেমস ক্যামেরন নির্মিত এই চলচ্চিত্র বাস্তব জাহাজডুবির পটভূমিতে নির্মিত হলেও এর প্রেমকাহিনি কাল্পনিক তবু এতটাই বাস্তব অনুভূত হয় যে দর্শক এখনো কাঁদে। জাহাজে দেখা হওয়া দুই তরুণ-তরুণী জ্যাক ডসন ও রোজ ডিউইট বুকাটের স্বল্প সময়েই প্রেমে পড়ে। কিন্তু জাহাজ ডুবে যাওয়ার সময় জ্যাক রোজকে বাঁচিয়ে নিজে বরফশীতল পানিতে মারা যায়। প্রেমের জন্য আত্মত্যাগ এই ধারণাকে নতুন করে জনপ্রিয় করে তোলে এই গল্প। বাস্তব ইতিহাসের ট্র্যাজেডির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এটি আরও গভীর আবেগ তৈরি করে।

অ্যাবেলার্ড ও হেলোয়িজ: মধ্যযুগের নিষিদ্ধ প্রেমফরাসি দার্শনিক পিটার অ্যাবেলার্ড ও তার ছাত্রী হেলোয়িজের প্রেম ছিল মধ্যযুগের সবচেয়ে আলোচিত এবং মর্মান্তিক কাহিনি। শিক্ষক-ছাত্রীর প্রেম সমাজ মেনে নেয়নি। হেলোয়িজের পরিবারের লোকেরা প্রতিশোধ নিতে অ্যাবেলার্ডকে নির্মমভাবে শাস্তি দেয়। পরে তারা দুজনই ধর্মজীবন বেছে নিলেও চিঠির মাধ্যমে সারাজীবন ভালোবাসা বজায় রেখেছিলেন। তাদের সেই চিঠিগুলো আজও বিশ্বের অন্যতম আবেগঘন প্রেমপত্র হিসেবে বিবেচিত।

মানুষের মনস্তত্ত্ব বলে, সুখের গল্প দ্রুত ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু বেদনার গল্প মনে গেঁথে থাকে। করুণ প্রেমকাহিনি মানুষের ভেতরের গভীর আবেগকে নাড়া দেয় ভালোবাসা, ভয়, হারানোর যন্ত্রণা, ত্যাগ সব অনুভূতি একসঙ্গে জাগিয়ে তোলে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ট্র্যাজেডি আমাদের সহানুভূতি বাড়ায়। যখন আমরা এমন গল্প পড়ি বা দেখি, তখন চরিত্রগুলোর অনুভূতির সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পাই। ফলে গল্পটি শুধু গল্প থাকে না ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মতো মনে হয়।

ভ্যালেন্টাইনস ডে সাধারণত আনন্দের উৎসব হিসেবে পরিচিত হলেও এর ইতিহাসও পুরোপুরি সুখের নয়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল প্রেমিকযুগলদের গোপনে বিয়ে দেওয়ার অপরাধে যা নিজেই এক ধরনের ট্র্যাজেডি। তাই বলা যায়, ভালোবাসা দিবসের শিকড়েই আছে ত্যাগ ও বেদনার গল্প।

আরও পড়ুনটেডি বিয়ার যেভাবে খেলনা থেকে ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠলোপছন্দের মানুষকে আজ প্রপোজ করেই ফেলুন

কেএসকে