জীবিকার প্রয়োজনে দেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি জমান বহু মানুষ। কেউ শুধু কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেন, কেউবা কাজের ফাঁকে খুঁজে নেন নিজের স্বপ্ন, নিজের ভালোবাসা। মালয়েশিয়াপ্রবাসী মো. ইয়াছিন ফরাজী তেমনই একজন, যিনি প্রবাসের ব্যস্ত ও কষ্টের জীবনেও শিল্পচর্চার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন।
কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার গোয়ালমারি গ্রামের মো. জসিম উদ্দিন ফরাজীর ছেলে মো. ইয়াছিন ফরাজী ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জীবিকার তাগিদে মালয়েশিয়ায় আসেন। প্রবাসে এসে নিয়মিত কাজ শুরু করলেও তার মনে সবসময়ই এক ধরনের শূন্যতা কাজ করত। গৎবাঁধা কাজের বাইরে নিজের ভালো লাগার কোনো সৃজনশীল কাজ করার ইচ্ছা ছিল বহুদিনের। যদিও শুরুতে সেই ইচ্ছার কোনো নির্দিষ্ট রূপ বা পরিকল্পনা ছিল না, তবুও মনে হতো জীবনটা শুধু কাজ আর ঘুমে আটকে থাকলে চলবে না।
তার এই সৃজনশীলতার বীজ বপন হয়েছিল অনেক আগেই। মাদরাসায় পড়াশোনার সময় থেকেই আরবি লেখার প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা ছিল। খুব আগ্রহ নিয়ে আরবি লেখা অনুশীলন করতেন। তবে তখন এসব লেখা যে একদিন শিল্পে রূপ নিতে পারে, ‘আরবি ক্যালিওগ্রাফি’ নামে পরিচিত একটি স্বতন্ত্র শিল্পধারা সে বিষয়ে তার কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তাই বিষয়টি তখন নিছক একটি সাধারণ অভ্যাস হিসেবেই রয়ে যায়।
মালয়েশিয়ায় আসার পর কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে তিনি বাংলা ও উর্দু শের (কবিতা) লিখতে শুরু করেন। লেখালেখির এই অভ্যাসই একদিন তাকে নতুন এক ভাবনার দিকে ঠেলে দেয়। মনে হলো, লেখার হাতটা যদি আরও শানিত করা যায়! এই ভাবনা থেকেই ইউটিউবে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে তিনি প্রথম বিস্তারিতভাবে আরবি ক্যালিওগ্রাফি সম্পর্কে জানতে পারেন।
এই সময় বাংলাদেশের প্রখ্যাত ক্যালিওগ্রাফি শিল্পী উসামা হকের কাজ তার নজরে আসে। উসামা হকের শিল্পকর্ম ও শেখানোর পদ্ধতি তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই অনুপ্রেরণার ফলেই ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তিনি উসামা হকের ক্যালিওগ্রাফি কোর্সে ভর্তি হন। শুরু হয় ইয়াছিন ফরাজীর জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
তবে পথটা সহজ ছিল না। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর, কখনো কখনো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিউটি শেষ করেও তিনি ক্যালিওগ্রাফি চর্চা চালিয়ে যেতেন। ক্লান্ত শরীর নিয়েও রাত জেগে অনুশীলন সবই ছিল স্বপ্নের টানে। কিন্তু এই শেখার মাঝপথেই নেমে আসে বড় ধাক্কা। কর্মক্ষেত্রে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় তার দুই হাতের আঙুলে মারাত্মক আঘাত লাগে। দীর্ঘ সময় অসুস্থ থাকার কারণে পেন্সিল বা তুলি ধরা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে কোর্স থেকেও তিনি অনেকটাই পিছিয়ে যান।
এই কঠিন সময়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার উপক্রম হলেও পাশে দাঁড়ান তার শিক্ষক উসামা হক। তার সাহস, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় ইয়াছিন ফরাজী আবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি পান। প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্যের সঙ্গে সুস্থ হয়ে পুনরায় ক্যালিওগ্রাফি চর্চা শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত সফলভাবে কোর্সটি সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি তিনি আরবি ক্যালিওগ্রাফি পেইন্টিং করে যাচ্ছেন। কোরআনের আয়াত, দোয়া ও কালিমায়ে তাইয়্যেবা দিয়ে সাজানো তার শিল্পকর্মগুলো ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত আইডির মাধ্যমে প্রচার করছেন। আনন্দের বিষয় হলো, তার কাজ শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় মালয়েশিয়ার স্থানীয় নাগরিকরাও তার শিল্পের প্রশংসা করছেন।
অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন একজন প্রবাসী শ্রমিক হয়েও কীভাবে তিনি এমন নিখুঁতভাবে এই শিল্প আয়ত্ত করেছেন। ইয়াছিন ফরাজীর জন্য সবচেয়ে গর্বের বিষয়, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন মসজিদে তার আঁকা ক্যালিওগ্রাফি স্থান পেয়েছে। এটি তার কাছে শুধু স্বীকৃতিই নয়, বরং আত্মতৃপ্তির এক অনন্য উপলব্ধি।
ইয়াছিন ফরাজী বলেন, প্রবাস জীবনে কাজের চাপ থাকবেই। কিন্তু দিনশেষে যখন রং-তুলি হাতে নিই, তখন সব ক্লান্তি ভুলে যাই। এই শিল্পচর্চাই এখন আমার মানসিক প্রশান্তির সবচেয়ে বড় উৎস।
প্রবাসের কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও ইয়াছিন ফরাজীর এই যাত্রা প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি আর ভালোবাসা থাকলে, দূরদেশেও নিজের স্বপ্নকে রঙিন করে তোলা সম্ভব।
এমআরএম