ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনের ১৮টিতেই বিএনপির ভূমিধস বিজয় হয়েছে। শুধুমাত্র শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে ছেড়ে দেওয়া সিলেট-৫ আসনটিতে জয় পায়নি বিএনপি। সেখানে বিজয়ী হয়েছেন ১১ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান।
বিভাগের ১৮ আসনে বিজয় অর্জন করে দলটি যে আলোচনায় এসেছে, ঠিক তার উল্টো সিলেট-৫ আসনে পরাজয়ের কারণে সমালোচনার মুখেও পড়েছে দলটি। যে কারণে নির্বাচনে হেরেও আলোচনায় রয়েছেন ওই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদ (চাকসু মামুন)।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির একটি ‘ভুল’ সিদ্ধান্তের কারণে এ আসনটি হারাতে হয়েছে। তা না হলে সিলেট বিভাগের একটি আসনও বিএনপির হাতছাড়া থাকতো না।
একইভাবে জকিগঞ্জ-কানাইঘাটের বাসিন্দারাও বলছেন, জমিয়তের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার আগে বিএনপির উচিত ছিল জরিপ করা। এখানে কার জনপ্রিয়তা কতটুকু, সেটি বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া উচিত ছিল।
তবে ভোটাররা বলছেন, নির্বাচনের আগ মুহূর্তে জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতিসহ ১৩ নেতাকে বহিষ্কারেরও প্রভাবও পড়েছে দলটির জোটের প্রার্থী উবায়দুল্লাহ ফারুকের ফলাফলে।
তবে বিএনপি বলছে, জোটের শরিক জমিয়তের প্রার্থীর সুপারিশে দলটির ১৩ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তা না হলে, জোটের স্বার্থ রক্ষা হতো না।
সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ-কানাইঘাট উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৫ আসনে অন্তত ৩০ বছর ধরে বিএনপির কোনো নেতা মনোনয়ন পাননি। যে কারণে এবার বেশ কয়েকজন নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু মনোনয় দানের শেষ ধাপে এসে এ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে মনোনয়ন দেয় বিএনপি।
এ সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন সিলেট জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ। তিনি এলাকায় চাকসু মামুন হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনে অংশ নিতে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
নির্বাচনে মামুন বেশ ভালো অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন। বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরাও প্রকাশ্যে-গোপনে তার পক্ষেই কাজ করছিলেন। ভোটারদের ধারণা ছিল ১১ দলের জোটের প্রার্থী আবুল হাসানের সঙ্গে মামুনের লড়াই হবে। শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন সেলিমসহ দুই উপজেলার ১৩ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।
অবশেষে ভোটে এ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের উবায়দুল্লাহ ফারুক। তিনি পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনর রশীদ পেয়েছেন ৫৭ হাজার ২৫১ ভোট।
এ আসনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জকিগঞ্জ উপজেলায় খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আবুল হাসান পেয়েছেন ৪৪ হাজার ১৯৭ ভোট, উবায়দুল্লাহ ফারুক পেয়েছেন ২০ হাজার ৮৬২ ভোট এবং মামুনুর রশিদ পেয়েছেন ২৫ হাজার ৩০৯ ভোট।
কানাইঘাট উপজেলায় খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আবুল হাসান পেয়েছেন ৩২ হাজার ২৪ ভোট, উবায়দুল্লাহ ফারুক পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৭ ভোট এবং মামুনুর রশিদ পেয়েছেন ৩১ হাজার ১৬৮ ভোট।
পোস্টাল ব্যালটসহ সকল কেন্দ্রের ফলাফল অনুযায়ী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনর রশীদ পেয়েছেন ৫৭ হাজার ২৫১ ভোট, খেলাফত মজলিসের মুফতি আবুল হাসান ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের উবায়দুল্লাহ ফারুক পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট।
ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই এ আসনটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির আসন বণ্টন কৌশল, বিদ্রোহী প্রার্থীর ভূমিকা এবং নির্বাচনের আগে দলের বহিষ্কার সিদ্ধান্ত সবকিছু মিলিয়ে ফলাফলের পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে বিএনপি ১৩ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলীয় পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, এই সিদ্ধান্তে সাংগঠনিক সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তৃণমূল পর্যায়ের কিছু কর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদের পাওয়া ভোট নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, তার ভোটের বড় অংশ যদি জোট প্রার্থীর পক্ষে যেত, তাহলে নির্বাচনের ফল ভিন্ন হতে পারতো।
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, একজন বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় আমরা এ আসনটি পাইনি। তা না হলে এ আসনটিও আমাদের ছিল। এজন্য বিদ্রোহী প্রার্থী ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে দল ব্যবস্থা নিয়েছে।
নির্বাচনের শেষ সময়ে এসে বিএনপি নেতাদের বহিষ্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, জোটের প্রার্থীর সুপারিশে তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জোটের প্রার্থীর দাবি ছিল-তারা দলে থাকলে নির্বাচনে সমস্যা হবে। জোটের স্বার্থ রক্ষায় তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
আহমেদ জামিল/এফএ/জেআইএম