জাতীয়

৪৯% ভোটকেন্দ্রে অননুমোদিত ব্যক্তির উপস্থিতি, ভোটের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় অর্ধেক ভোটকেন্দ্রে অনুমোদিত নয় এমন ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ভয়েস নেটওয়ার্ক। তাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের অনিয়ম ভোটের পরিবেশ ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্ল্যাটফরম ভয়েস নেটওয়ার্কের পর্যবেক্ষণের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন ভয়েস নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দীন। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংগঠনের নির্বাহী কমিটির সভাপতি ও ইমপ্যার ইনিশিয়েটিভের সিইও এনায়েত হোসেন জাকারিয়া এবং রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর বুরহান উদ্দীন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সেক্রেটারি একরামুল হক সায়েম। এ সময় হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির সিইও ইজাজুল ইসলাম ও বাকেরগঞ্জ ফোরামের নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম হাওলাদারসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের নির্বাচনে প্রায় ৭ শতাংশ কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকদের প্রবেশ ও কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়। ৭ শতাংশ কেন্দ্র সঠিকভাবে চিহ্নিত ছিল না। ১১ শতাংশ কেন্দ্রে প্রবীণ ও শারীরিকভাবে অক্ষম ভোটারদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা ছিল না। ২০ শতাংশ কেন্দ্রে গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা অনুপস্থিত ছিল। ১১ শতাংশ কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল অপর্যাপ্ত। প্রায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে নিরাপত্তাকর্মীদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া ৪৯ শতাংশ কেন্দ্রে অনুমোদিত নয় এমন ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

ভোটগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে সংগঠনটির প্রতিবেদনে উঠে আসে, ৪ শতাংশ কেন্দ্রে কোনো এক পক্ষের পোলিং এজেন্ট অনুপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন আসনে এজেন্ট বের করে দেওয়া, ব্যালট ছিনতাই ও চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়। ৮ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটার পরিচয় যাচাই যথাযথভাবে হয়নি। ৪ শতাংশ কেন্দ্রে জালভোটের অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুননির্বাচনে ২১.৪ শতাংশ জালভোট পড়ার তথ্য ভিত্তিহীন: টিআইবি সন্ধ্যায় চরমোনাই পীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন তারেক রহমান 

এছাড়া ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটার হুমকি ও ভয়ভীতির কারণে ভোট দিতে পারেননি। তবে এসব অনিয়মের মধ্যেও ভোটার উপস্থিতি ও অংশগ্রহণকে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।

ভোট গণনায় স্বচ্ছতার ঘাটতিভয়েস নেটওয়ার্ক জানায়, ভোট গণনা ও ফলাফল টেবুলেশনে বেশ কিছু সমস্যা দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে- সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব, ব্যালট যাচাইয়ে ঘাটতি, ফলাফল পাঠাতে বিলম্ব, পর্যবেক্ষকদের সীমিত প্রবেশাধিকার। এসব কারণে ফলাফল প্রকাশের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

গণমাধ্যমের ভূমিকা বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের সময় অনেক গণমাধ্যম নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেনি। কিছু ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক সংবাদ, ভুল তথ্য ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে, যা ভোটারদের তথ্য জানার অধিকার ও সচেতনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাপ্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার বিষয়টি।

সংগঠনটির দাবি, ফল ঘোষণার পর দেশের প্রায় সব বিভাগে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ জেলায় অন্তত ৭০টি সহিংসতার তথ্য পাওয়া গেছে।এর মধ্যে বাগেরহাট ও মুন্সিগঞ্জে দুজন নিহত হন। নোয়াখালীতে ভোট দেওয়ার কারণে এক নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলেও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। দিনাজপুর, নাটোর, পঞ্চগড়, ফেনী, কুমিল্লা, পটুয়াখালী, বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় সহিংসতার তথ্য রয়েছে।

ভয়েস নেটওয়ার্কের মতে, এই সহিংসতা সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি জনগণের যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার, বিজয়ী রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

সংগঠনটির মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধ, অপরাধীদের বিচার এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা আরও দুর্বল হবে।

ইএআর/কেএসআর