রাজনীতি

বিভাজনের সমাজ চাই না, সবাইকে নিয়ে কাজ করবো: জাহাঙ্গীর হোসেন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন তার নির্বাচনি এলাকার উন্নয়নে জনগণের চাওয়াকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে তিনি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ এলাকাকে অপরাধমুক্ত করার জোর দিয়েছেন। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিন।

জাগো নিউজ: নতুন এমপি হিসেবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম কোন কাজটিতে হাত দিতে চান?

জাহাঙ্গীর হোসেন: জনগণ যে কাজটি চাইবে, আমি সেটাই করবো। জনগণের চাহিদা অনুযায়ীই কাজ করবো। সেজন্য এলাকাভিত্তিক চাহিদাপত্র নেবো। চাহিদা অনুযায়ী সরকার থেকে তা আদায় করবো। আমরা বিল দেই, কিন্তু গ্যাস পাই না। রান্না করতে সমস্যা হয়। নারীরা কষ্ট পান। গ্যাস বিভাগে সঙ্গে সমন্বয় করে প্রবাহ বাড়াতে চাই। আর অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে প্রথম দ্বিতীয় নয়। জনগণের জন্য যখন যে কাজটি বেশি প্রয়োজন হবে, সেটিই করবো। সবচেয়ে বেশি দরকার সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে দিতে হবে। সোশ্যাল সিকিউরিটি থাকলে অনেক খারাপ ঘটনা ঘটবে না। আমার-আপনার সন্তান—যদি জানে আইন সক্রিয়, তাহলে অপরাধ কমবে। মাদক ব্যবসায়ী যদি বুঝে যায় ছাড় পাবে না, তাহলে মাদক কমে যাবে। মূল জায়গাটি হলো সামাজিক দায়বদ্ধতা। প্রতিবাদ বাড়াতে হবে। তাহলেই সমাজে অসংগতি কমবে।

জাগো নিউজ: আপনার প্রতিশ্রুতি ছিল, এলাকাকে কিশোর গ্যাং মুক্ত করার। ঢাকা-১৮ কে কিশোর গ্যাংমুক্ত করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেবেন?

জাহাঙ্গীর হোসেন: যে কোনো এলাকাকে কিশোর গ্যাংমুক্ত করতে প্রথমেই প্রয়োজন সামাজিক নিরাপত্তা। ধরেন, আমি বিএনপি করি, আপনি আওয়ামী লীগ—এই বিভাজন দিয়ে মানুষকে একে অন্যের বিরুদ্ধে লাগানো হয়েছিল। এজন্য কিশোর গ্যাং বেড়েছিল। একজনের সন্তান খারাপ কাজ করলে আরেকজন প্রতিবাদ করতেন না। কিছুই বলতেন না। সমাজের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। সামাজিক কিছু কাজ আছে সেগুলো সবাইকে করতে হবে। অপরাধ করলে প্রতিবাদ করতে হবে। সচেতনতা বাড়লে, সমাজ কিশোর গ্যাংমুক্ত হবে।

জাগো নিউজ: মাদকের বিষয়ে আপনাদের ভাবনা কী?

জাহাঙ্গীর হোসেন: মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। নিজের সন্তানের খেয়াল রাখতে হবে। যেখানে মাদক ব্যবসা হয়, সেগুলো আমরা চিহ্নিত করবো। মাদক দূর করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সক্রিয় হতে হবে। প্রচলিত আইন প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই কমবে। মাদক কমাতে এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর পদক্ষেপ নেবো।

জাগো নিউজ: আপনার এলাকায় রেললাইনের পূর্বপাশে উত্তরখান, দক্ষিণখান ও খিলক্ষেতে রিকশার যানজট কমাতে কী উদ্যোগ নেবেন?

জাহাঙ্গীর হোসেন: আমাদের এলাকায় রাস্তার অবস্থা খারাপ। যানজটে সময় নষ্ট হয়। সেজন্য সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কথা বলবো। পরিকল্পনা করবো। একদিনে সমাধান হবে না। কিন্তু এই যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রেলগেট এলাকায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। এটা আমরা কমাতে চাই। আধা ঘণ্টায় নামিয়ে আনতে পারলেও উপকার হবে। এই এলাকার জন্য আমরা ট্রাফিক পুলিশ চাইবো।

জাগো নিউজ: অটোরিকশা লাইসেন্সিংয়ের আওতায় আনবেন, এমন কোনো উদ্যোগ?

জাহাঙ্গীর হোসেন: আমরা অটোরিকশাগুলোর ডাটাবেজ করবো। চালকদের চিহ্নিত করবো। সেজন্য লাইসেন্স ফি নেবো না। ওরা গরিব মানুষ। প্রয়োজনে সিটি করপোরেশন থেকে লাইসেন্স করিয়ে দেবো। আমার লক্ষ্য কার্যক্রম স্মুথ করা। চালক ও যাত্রী দুজনের সুবিধা নিশ্চিত করা।

জাগো নিউজ: অনেকেই মনে করেন ঢাকা-১৮ মানেই উত্তরা। মানে আধুনিক উত্তরা। বিপরীতে রেললাইনের পূর্ব পাশের এলাকা অবহেলিত। রাস্তাঘাটের অবস্থা করুণ।

জাহাঙ্গীর হোসেন: শপথের পরই এটি নিয়ে আমি কাজ শুরু করবো। শুধু উত্তরা মডেল টাউন শুনতে চাই না। শুনতে চাই ‘ঢাকা-১৮ মডেল টাউন’। ঢাকা-১৮ কে মডেল টাউনে পরিণত করতে চাই। এটি একদিনে হবে না। কিন্তু পাঁচ বছরে অনেক দূর এগোতে চাই।

জাগো নিউজ: আপনার এলাকার রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ, এ বিষয়ে দ্রুত কিছু করা যায় কি না?

জাহাঙ্গীর হোসেন: কোন রাস্তা বেশি জরুরি, প্রথমে সেটা চিহ্নিত করবো। যেখানে বেশি মানুষ থাকে, সেখানকার রাস্তাকে প্রথমে অগ্রাধিকার দেবো। কম খরচে বেশি মানুষের উপকার হয়—এটি মাথায় রাখবো। সিটি করপোরেশনের সহযোগিতা নেবো।

জাগো নিউজ: আধুনিক উত্তরায় নতুন নতুন রাস্তা হয়েছে, বিশেষত মেট্রোরেলের আশপাশে। সেখানে ধূলির আধিক্য। সিটি করপোরেশনের গাড়ি থেকেও ময়লা পড়ে রাস্তা নষ্ট হচ্ছে। সেখানে কোনো উদ্যোগ নেবেন কী?

জাহাঙ্গীর হোসেন: হ্যাঁ, নির্বাচিত সরকার না থাকায় এলাকার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় ছিলো না। রাজনৈতিক সরকার থাকলে সমন্বয় বাড়বে। কাজের গতি বাড়বে। এ এলাকায় যেন পরিবেশ দূষণ না ঘটে সেটিকে আমরা সব সময় বিবেচনায় রাখবো।

জাগো নিউজ: উত্তরায় একটি আধুনিক হাসপাতালের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটির বিষয়ে কী ভাবছেন?

জাহাঙ্গীর হোসেন: এখানে ভালো হাসপাতাল কম। বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল আছে। দক্ষিণখান-উত্তরখানে ভালো হাসপাতাল নেই। সেখানে দ্রুত একটি আধুনিক হাসপাতাল করার চেষ্টা করবো।

জাগো নিউজ: নির্বাচনের পর আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কী বার্তা দিচ্ছেন?

জাহাঙ্গীর হোসেন: নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীকে আমি আমার বাসায় ডেকেছি। তারা বাসায় এসেছিলেন। এনসিপির আরিফুল ইসলাম আদিব, স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনি ও জাতীয় পার্টির নেতাও এসেছিলেন। জামায়াতের নেতারাও আসবেন। আমি দ্বিধাবিভক্ত সমাজ চাই না। যে যার রাজনীতি করবে। জনগণ যাকে ভালো মনে করবে, তাকে বেছে নেবে। কারণ আমরা একসঙ্গে থাকলে হানাহানি কমবে। আমি একা সব করতে পারবো না। সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। আমার নির্বাচনি প্রোগ্রামে আদিবকে ডেকে এনে বলেছি-তুমি বক্তব্য দাও। জনগণ যাকে পছন্দ করবে তাকেই ভোট দেবে। আমার সমাবেশে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির প্রার্থী বক্তব্য দিয়েছেন। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এমনটি হয়নি, আমি সেটি করেছি। আমি আগেও যা করেছি, ভবিষ্যতেও তাই করবো।

জাগো নিউজ: আপনার আসনে মাঠে এনসিপি বা জামায়াতের তেমন সমর্থক দেখা যায়নি। কিন্তু আপনার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির আরিফুল ইসলাম বেশ ভালো ভোট পেয়েছেন। কী বলবেন?

জাহাঙ্গীর হোসেন: ভোট জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। মিছিল বড় হলেই ভোট বেশি হবে—এমন না। জনগণ নীরবে ভোট দিতে পারে। কেন দিয়েছে, সেটা জনগণ জানেন। আমি বলতে পারবো না। আমার ঢাকা-১৮ আসনে আমি বাহ্যিকভাবে যা দেখেছি, ভালো ভোট হয়েছে। অযথা কাউকে দোষ দেবো না।

ইএইচটি/এমআরএম