বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। দেশের মানুষ প্রতি বছর গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে পবিত্র রমজান মাসের জন্য- একটি মাস যা কেবল ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার জন্য নয়, বরং সামাজিক একতা, আত্মশুদ্ধি এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে এই পবিত্র মাসটি অনেক সময় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য অর্থনৈতিক দিক থেকে চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে তারা রোজা পালন করেন, অন্যদিকে বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি তাদের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তোলে।
জোরালো অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবছর এক শ্রেণির ব্যবসায়ী রোজার সময় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি করে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, সবজি, গোশত- প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম এই সময়ে হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় দাম বৃদ্ধি সামান্য হলেও নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মানুষের জন্য তা বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে, যারা প্রতিদিনের আয়-রোজগারের ওপর নির্ভরশীল, তারা রোজার মাসেও সহজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি পদক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন। নিয়মিত বাজার মনিটরিং, দামের তালিকা প্রকাশ, ওষুধ, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সীমিত মূল্য নির্ধারণ-এসবই কার্যকর উপায় হতে পারে। শুধু প্রশাসনিক নজরদারি নয়, সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাহক, ভোক্তা অধিকার সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসন মিলে একসাথে কাজ করলে ব্যবসায়ীদের অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধি কমানো সম্ভব।
আশা করা যায়- এই বছর রোজার মাসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় থাকবে। ধারণা করা হচ্ছে- দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এই সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। যদি সরকার এই পবিত্র মাসে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করতে ব্যর্থ হয়, তবে এটি তাদের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অন্যদিকে, যদি সরকার সফলভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে এটি তাদের প্রতি মানুষের আস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্ষমতার একটি শক্তিশালী প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে। এটি সরকারের জন্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক দায়িত্ব নয় বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্বও বটে।
বাজারে নিয়ন্ত্রণ কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীদের মধ্যে সামাজিক নৈতিকতার মান উন্নয়নও অপরিহার্য। রোজার সময় পণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে লোভ এবং স্বার্থচিন্তা থাকে। সরকারের উচিত, ব্যবসায়ীদের সচেতন করা এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল বানাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। উদাহরণস্বরূপ, মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা, স্থানীয় সমিতি ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় এবং নিয়মিত মূল্য তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, রোজার মাসে খাদ্য নিরাপত্তা এবং মূল্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মানুষ রোজার মাসে বাজার থেকে সঠিক দামেই খাদ্য পেতে সক্ষম হলে, তারা রোজা পালন করতে পারবে অনায়াসে। এছাড়া, ব্যবসায়ীরা যদি নিয়ন্ত্রিত ও ন্যায্য মূল্যে পণ্য বিক্রি করে, তবে দেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বজায় থাকে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা আসে।
রোজাদারদের স্বস্তি নিশ্চিত করা মানে সাধারণ মানুষের জীবনে সুখ, শান্তি এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। এটি কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তাও। আশা করা যায়, নতুন সরকার এই রোজার মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং মানুষের আস্থা অর্জন করবে। এই মাসটি হবে সাধারণ মানুষ ও সরকারের মধ্যে বিশ্বাস এবং ন্যায়বিচারের প্রতিফলন।
অন্যদিকে, যদি সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে এটি সামাজিক অসন্তোষের কারণ হতে পারে। মানুষ মনে করতে পারে, তাদের জন্য সরকার কার্যকর হচ্ছে না। বিশেষ করে রোজার মাসে, যখন মানুষ সবার উপরে আধ্যাত্মিক ও নৈতিকভাবে সংবেদনশীল থাকে, তখন দ্রব্যমূল্যের অযৌক্তিক বৃদ্ধি সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এটি সরকারকে প্রথম মাসেই জনমতের পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাবে।
এ জন্য একাধিক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, বাজারে মূল্য নিরীক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংস্থার সংমিশ্রিত তৎপরতা থাকা আবশ্যক। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ীদের মধ্যে নৈতিক ব্যবসা করার মানসিকতা বৃদ্ধি করতে শিক্ষা ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তৃতীয়ত, জনগণকে সচেতন করা- যেমন কনজ্যুমার রাইটস এবং বাজারের তথ্য শেয়ার করা যাতে তারা ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গতভাবে কেনাকাটা করতে পারে।
রোজার মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি সামাজিক ন্যায় এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলনও। যারা রোজা রাখেন, তাদের জন্য সহজলভ্য এবং সঠিক মূল্যে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতি ও কার্যক্রম মানুষকে সরাসরি স্বস্তি এবং নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রোজার মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, গ্যাসোলিন এবং পরিবহন খরচও মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়কে প্রভাবিত করে। এই সময়ে যদি এই খাতে মূল্য বৃদ্ধি পায়, তবে সাধারণ মানুষ আরও চাপের মধ্যে পড়ে। তাই সরকারকে সামগ্রিকভাবে এই খাতগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে সীমিত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
তদুপরি, সামাজিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্কও এই মাসে বিশেষভাবে কার্যকর হতে হবে। যেমন- দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের জন্য খাদ্য বিতরণ, ভাতা প্রদান বা বিশেষ ছাড় ব্যবস্থা। এটি শুধু দরিদ্রদের সাহায্য করবে না, বরং বাজারে দাম বাড়ার প্রলোভন কমাবে। কারণ ব্যবসায়ীরা জানবে, যারা ক্রয় করতে সক্ষম, তাদের জন্য বাজার নিয়ন্ত্রিত এবং স্বচ্ছ।
আরেকটি দিক হলো মনিটরিং প্রযুক্তির ব্যবহার। আজকের দিনে মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে দ্রব্যমূল্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। দাম বেড়েছে কি না- মানুষ তা সহজেই রিপোর্ট করতে পারবে, আর প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। এটি একটি কার্যকর এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থা, যা রোজার সময়ে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করবে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। রোজার মাসে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে সাধারণ মানুষ মনে করতে পারে, সরকার তাদের স্বার্থে কাজ করছে না। এটি নতুন সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। অন্যদিকে, যদি সরকার সঠিকভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থা বজায় রাখে, তবে তা তাদের প্রতি মানুষের আস্থা এবং বিশ্বাস বাড়াবে। এটি সরকারের সক্ষমতার একটি স্পষ্ট প্রমাণ হবে।
সর্বশেষে বলা যায়, রোজার মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ নতুন সরকার, বিশেষ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এক ধরনের প্রাথমিক পরীক্ষা। এটি দেখাবে তারা সাধারণ মানুষের স্বার্থে কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি, এটি দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক শান্তি বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ। একটি সংবেদনশীল, ন্যায্য ও সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা শুধু অর্থনৈতিক উপকারই নয়, মানুষের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক শান্তির জন্যও অপরিহার্য।
রোজাদারদের স্বস্তি নিশ্চিত করা মানে সাধারণ মানুষের জীবনে সুখ, শান্তি এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। এটি কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তাও। আশা করা যায়, নতুন সরকার এই রোজার মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং মানুষের আস্থা অর্জন করবে। এই মাসটি হবে সাধারণ মানুষ ও সরকারের মধ্যে বিশ্বাস এবং ন্যায়বিচারের প্রতিফলন।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
এইচআর/জেআইএম