ইরান বলছে, তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘মূল নীতিগুলো’ নিয়ে তারা একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। জেনেভায় পরোক্ষ আলোচনার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, এ সংক্রান্ত আরও কাজ বাকী আছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে ‘অগ্রগতি হয়েছে’। খবর বিবিসির।
এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি বলেছেন, ভালো অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা শেষ হয়েছে এবং এতে কারিগরী বিষয়গুলোর পাশাপাশি সাধারণ করনীয়গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সাম্প্রতিক সরকার বিরোধী বিক্ষোভে প্রাণঘাতী দমন অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার হুমকির প্রেক্ষাপটে এবারের আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে বলেছেন, তার বিশ্বাস ইরান একটি চুক্তি করতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা সন্দেহ করছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। যদিও তেহরান সবসময়ই তা অস্বীকার করে আসছে।
মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডে ওমানের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে অনুষ্ঠিত আলোচনার আগে ইরান জানিয়েছিল, তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে গুরুত্ব দেবে।
ওয়াশিংটন এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নসহ অন্যান্য বিষয়ও আলোচনা করতে চায়। তবে জেনেভায় কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে তা তাৎক্ষণিক জানা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, অগ্রগতি হয়েছে, তবে এখনো অনেক বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে। ইরানিরা বলছে, তারা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বিস্তারিত প্রস্তাব নিয়ে ফিরবে, যাতে আমাদের অবস্থানের মধ্যে থাকা কিছু অমীমাংসিত ব্যবধান দূর করা যায়।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে এটি ভালো হয়েছে। তারা আবারো বসতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু অন্য দিকে প্রেসিডেন্ট কিছু বিষয় নির্ধারণ করেছেন যা ইরানিরা স্বীকার করে নিতে বা এ বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহী নয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন যে, তিনি পরোক্ষভাবে নিজেও আলোচনায় জড়িত হবেন এবং তেহরান এবার আলোচনায় আগ্রহী বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমি মনে করি চুক্তি না করার পরিণতি তারা চায় না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমা নিক্ষেপের সময়েই ইরান বুঝতে পেরেছে যে পরিণতির ধরণ কেমন হতে পারে।
তিনি বলেন, আমরা তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে বি-২ বোমারু বিমান না পাঠিয়ে একটি চুক্তি করতে পারতাম। কিন্তু আমাদের বি-২ পাঠাতেই হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, আমি আশা করি তারা আরও যুক্তিসংগত হবে। মূলত এর মাধ্যমে তিনি ইরানে হামলা চালানো বোমারু বিমানের কথাই বোঝাতে চেয়েছেন।
গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছে। স্যাটেলাইটে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিফাই নিশ্চিত হয়েছে যে, ইরানের কাছেই বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন অবস্থান করছে।
এছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর খবর পাওয়া গেছে। আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যেই এটি ওই অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে।
মঙ্গলবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ট্রাম্পের সামরিক হুমকির জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আরও বিপজ্জনক হলো সেই অস্ত্র যা বিমানবাহী রণতরীকে সাগরের তলদেশে পাঠাতে পারে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী। শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও কখনো এমন আঘাত পেতে পারে যে তারা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারে না।
খামেনি অভিযোগ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার আগেই এর ফল ঠিক করার চেষ্টা করছে যা ‘ভুল ও বোকার কাজ’ হবে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে বিবিসি ভেরিফাই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ডেস্ট্রয়ার, যুদ্ধ জাহাজ ও ফাইটার বিমানের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিও চিহ্নিত করতে পেরেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বার আরাঘচি সোমবার জাতিসংঘ পরমাণু সংস্থার প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, তিনি জেনেভায় এসেছেন, ‘একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক চুক্তি অর্জনের জন্য’।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির জবাবে ইরানও তার বাহিনীর শক্তি প্রদর্শন করেছে। সোমবার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ওমান ও ইরানের মাঝে উপসাগরীয় এলাকার হরমুজ প্রণালীতে একটি সামুদ্রিক মহড়া চালিয়েছে।
হরমুজ প্রণালীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর তেল রপ্তানির প্রধান রুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো খুবই কঠিন। আমার মনে হয় এখানে কূটনৈতিকভাবে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ আছে। তবে আমি একে অতিরঞ্জিতও করতে চাই না। এটি করা কঠিন হবে।
চলতি বছর ওমানে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে প্রথম সরাসরি আলোচনা হয়েছে। সেটি ‘সুন্দর সূচনা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
টিটিএন