বগুড়ার রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। উত্তরবঙ্গের এই জেলাটি একসময় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল ও ভোটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এখানে জামায়াতপন্থি প্রার্থীদের ভোটসংখ্যা অনেকের ধারণাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বগুড়ার বিভিন্ন আসনে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছেন। প্রত্যেকেই এক লাখের কাছাকাছি বা তার বেশি ভোট পেয়েছেন। এরমধ্যে বগুড়া-১ আসনে শাহাবুদ্দিন ৫৭ হাজার ৯৫৯ ভোট, বগুড়া-২ আসনে শাহাদুজ্জামান ৯২ হাজার ৪৩৩ ভোট, বগুড়া-৩ আসনে নূর মোহাম্মদ এক লাখ ১১ হাজার ২৬ ভোট, বগুড়া-৪ আসনে মোস্তফা ফয়সাল এক লাখ ৮ হাজার ১৯১ ভোট, বগুড়া-৫ আসনে দবিরুর রহমান এক লাখ ৪২ হাজরর ৯১ ভোট, বগুড়া-৬ আসনে আবিদুর রহমান ৯৭ হাজার ৬২৬ ভোট এবং বগুড়া-৭ আসনে গোলাম রব্বানী পেয়েছেন এক লাখ ৫ হাজার ১৮৪ ভোট।
এই পরিসংখ্যান শুধু ভোট সংখ্যা নয়, বগুড়ার রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের একটি নতুন দিকও তুলে ধরে। প্রশ্ন উঠছে কী কারণে জামায়াতপন্থি প্রার্থীরা এত ভোট পেলেন?
২০০০ সালের পর বগুড়ায় অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর সরাসরি ভোটের পরিসংখ্যান খুব বেশি সময়ই দৃশ্যমান ছিল না। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে দলটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে থেকে কয়েকটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং জোটের অংশ হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভোট পায়। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে তারা আবারও জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। ফলে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের আলাদা ভোটের হিসাব বেশিরভাগ আসনে আলাদাভাবে দৃশ্যমান হয়নি। তখন সাধারণভাবে জোট প্রার্থীরা ৫০-৭০ হাজারের মতো ভোট পেতেন বলে নির্বাচনি তথ্য থেকে ধারণা মেলে। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত জোট বর্জন করায় ওই নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ভোটের হিসাব নেই।
২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনেও জামায়াত সরাসরি নিজেদের প্রতীকে অংশ নেয়নি। বিএনপি জোটের ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী দেয় দলটি। ফলে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পৃথক ভোটসংখ্যা তখনো প্রকাশ পায়নি। অর্থাৎ ২০০১ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত চারটি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে একটিতে বর্জন, দুটিতে জোটের প্রতীকে নির্বাচন এবং মাত্র সীমিত ক্ষেত্রে নিজস্ব প্রতীকে অংশ নেওয়ার কারণে দাঁড়িপাল্লার স্বতন্ত্র ভোটভিত্তি দীর্ঘ সময় পরিসংখ্যানের আড়ালেই ছিল। যা পরবর্তী নির্বাচনে আলাদা প্রতীকে ভোটের পরিমাণ দৃশ্যমান হওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দলীয় রাজনীতির শূন্যতা ও বিকল্প খোঁজাস্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, প্রার্থী বাছাই নিয়ে অসন্তোষ এবং সংগঠনের দুর্বলতা অনেক ভোটারকে বিকল্প খোঁজার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বগুড়ায় বড় দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিভাজন নতুন কোনো বিষয় নয়। নির্বাচনের সময় এসব দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে, যা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলে। এ অবস্থায় সংগঠিত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে মাঠে থাকা জামায়াত বা তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক ধরে রাখতে পেরেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
তৃণমূলভিত্তিক সংগঠনবগুড়ার বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জামায়াতের তৃণমূল সংগঠন এখনো অনেক জায়গায় সক্রিয়। বিশেষ করে মসজিদকেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং পারিবারিক প্রভাবের কারণে তাদের একটি স্থায়ী সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল হামিদ বলছেন, বড় দলগুলো যেখানে নির্বাচনের সময় হঠাৎ সক্রিয় হয়, সেখানে জামায়াতপন্থিরা বছরের পর বছর একই এলাকায় সামাজিক ও সাংগঠনিক যোগাযোগ ধরে রাখেন। ফলে ভোটের সময় তারা একটি নির্দিষ্ট ভিত্তি থেকে ভোট সংগ্রহ করতে পারে।
প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজের প্রভাবজামায়াতের বেশ কয়েকজন প্রার্থী স্থানীয়ভাবে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় ভোটারদের একটি অংশ দলীয় প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজকে গুরুত্ব দেয়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ‘ভদ্র’, ‘ধর্মভীরু’ বা ‘সামাজিকভাবে পরিচিত’ প্রার্থী অনেক সময় দলীয় অবস্থানকে ছাপিয়ে যায়। ফলে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ইমেজের সুবিধা পেয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বগুড়ার কয়েকটি আসনে একাধিক প্রার্থী থাকায় ভোট বিভক্ত হয়েছে। এ বিভক্তির সুযোগ নিয়ে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা তুলনামূলক বেশি ভোট পেয়েছেন। একাধিক আসনে দেখা গেছে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে ভোটের ব্যবধান বেশ কম। জামায়াতপন্থিরা উল্লেখযোগ্য ভোট ধরে রেখেছেন। ফলে মোট ভোটের হিসাবে তাদের অবস্থান দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
নীরব ভোটব্যাংকস্থানীয় রাজনীতিবিদ আবু জাফর জাগো নিউজকে বলেন, ‘বগুড়ায় একটি নীরব ধর্মভিত্তিক ভোটব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই ছিল, যা সবসময় প্রকাশ্যে দৃশ্যমান ছিল না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভোটব্যাংক এখন বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। অনেক ভোটার প্রকাশ্যে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান জানান না, কিন্তু ভোটের সময় নির্দিষ্ট আদর্শ বা প্রভাবের ভিত্তিতে ভোট দেন। এই নীরব সমর্থকরাই জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীদের ভোটসংখ্যা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ আরও বলেন, ‘এই পরিসংখ্যানকে শুধুমাত্র একটি দলের শক্তি বৃদ্ধির সূচক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি বগুড়ার রাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে ভোটাররা প্রচলিত দুই দলের বাইরে বিকল্প শক্তিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।’
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একটি অংশ আদর্শভিত্তিক বা স্থানীয় ইস্যুকেন্দ্রিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকছেন। ফলে সংগঠিত যে কোনো রাজনৈতিক শক্তি এখানে জায়গা করে নিতে পারছে।
তার মতে, এই ভোটসংখ্যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। যদি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং প্রার্থী বাছাইয়ের সমস্যা দূর করতে না পারে, তাহলে তৃতীয় শক্তির উত্থান আরও স্পষ্ট হতে পারে।
অন্যদিকে, জামায়াত বা তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা যদি এই ভোটব্যাংক ধরে রাখতে পারেন, সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও জোরদার করেন, তাহলে বগুড়ার রাজনীতিতে তাদের প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।
এসআর/এএসএম