দেশজুড়ে

প্রার্থীদের অহংকার-অভ্যন্তরীণ কোন্দলই বিএনপির ভরাডুবির কারণ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে বিএনপি প্রার্থীদের পরাজিত করে ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে জামায়াতে ইসলামী। জেলার তিনটি আসনেই তারা ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তবে রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ১৯৯০ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে বিবেচনা করা হতো বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে। টানা কয়েকটি জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এমনকি ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জেলার দুটি আসনে জয় পায় বিএনপি।

তাহলে সেই শক্ত ঘাঁটিতে এবার কেন ভরাডুবি? রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে এ বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব রফিকুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‌‘বিএনপি গত ১৭ বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। গত ৫ আগস্ট সেই আন্দোলনের পর্ব শেষ হয়েছে। নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল, ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন আন্দোলনের সঙ্গে থাকা পরীক্ষিত নেতারা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘জেলার তিনটি আসনে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়, তারা কেউই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন না। মনোনয়ন পাওয়ার পর আমরা তাদের অভিনন্দন জানিয়েছি। কিন্তু তারা জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়নের কোনো নেতা-কর্মীর সঙ্গে সমন্বয় করেননি। ডাকেননি, যোগাযোগ রাখেননি। এমনকি বড় দলীয় অনুষ্ঠানেও স্থানীয় নেতাদের উপেক্ষা করা হয়েছে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিএনপির এই নেতার ভাষ্য, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত অহংকার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলই ভরাডুবির অন্যতম কারণ।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রার্থীরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে কাজ করেছেন, অথচ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করা বিএনপির নেতারা বঞ্চিত হয়েছেন। এতে তৃণমূল পর্যায়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।’

পরাজয়ের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘মনোনয়ন পাওয়া তিনজন প্রার্থীই জেলার বাইরে বসবাস করেন। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংকটময় সময়ে তাদের পাওয়া যায় না। ভোট শেষ হলেই ঢাকায় চলে যান। বিদেশে চলে যান। জনগণ এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই ভোট দিয়েছেন।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাসে তিনটি আসন একসঙ্গে বিএনপির বাইরে যাওয়ার নজির নেই জানিয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এবার হয়েছে। এর দায় আমাদের প্রার্থীদেরই নিতে হবে। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের চিত্র বাইরের জেলাতেও নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনটি জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন। এখানে বিএনপির ভোটব্যাংক ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে জেলা বিএনপি নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে বলে স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ। গ্রুপিং ও অন্তর্কোন্দল প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন ঘটনায় নেতাকর্মীরা টালমাটাল অবস্থায় রয়েছেন।

সংকট উত্তরণের পরামর্শ দিয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জে পুনরায় সংগঠন শক্তিশালী করতে বিএনপিকে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। দলীয় কোন্দল নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ, তৃণমূল কর্মীদের পুনরুজ্জীবিত করা, প্রার্থী নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতে হঠাৎ এমন ভরাডুবি বিএনপির জন্য বড় সতর্কবার্তা। প্রার্থীদের অহংকার, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সাংগঠনিক দুর্বলতা—সবকিছু মিলিয়েই চাঁপাইনবাবগঞ্জে দলটির এই পরাজয় ঘটেছে বলে মনে করছেন তিনি।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার তিনটি আসনেই বড় ব্যবধানে জিতেছে জামায়াতে ইসলামী।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান মিঞা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন এক লাখ ৬২ হাজার ৫১৫ ভোট। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কেরামত আলী ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন দুই লাখ ৬ হাজার ৮৯৩ ভোট। এ আসনে ভোটের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৩৭৮।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ বিএনপির প্রার্থী আমিনুল ইসলাম পেয়েছেন এক লাখ ৫৫ হাজার ১১৯ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী পেয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজার ২২৭ ভোট। এখানে ব্যবধান ১৬ হাজার ১০৮ ভোট।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী হারুনুর রশিদ পেয়েছেন এক লাখ ২৭ হাজার ৩৭ ভোট। সেখানে জামায়াতের প্রার্থী নূরুল ইসলাম বুলবুল এক লাখ ৮৯ হাজার ৬৪০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। এ আসনে ব্যবধান সর্বোচ্চ ৬২ হাজার ৬০৩ ভোট।

এসআর/এএসএম