আইন-আদালত

জিয়াউল আহসানকে ‘সিরিয়াল কিলার’ বলেই পদোন্নতির বিরোধিতা করেছিলাম

সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সিরিয়াল কিলার হওয়ার অভিযোগ উঠায় তার পদোন্নতির পক্ষে ছিলেন না বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরার জবাবে তিনি এমন কথা বলেন।

এদিন তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনি টিটো। এর পর আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী জেরার দিন ঠিক করা হয়েছে।

জেরায় সাক্ষী বলেন, ‘আমি সেনাপ্রধান পদে থাকার সময় জিয়াউল আহসান লে. কর্নেল থেকে কর্নেল পদে পদোন্নতি পান। প্রমোশন বোর্ডের অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বোর্ডের অনেক সদস্যই নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বার্থ চিন্তা করে পদোন্নতির পক্ষে মতামত দিয়েছেন। আমি মেজর জেনারেল মোমেনকে ডেকে বলেছি যে, জিয়াউল আহসান একজন সিরিয়াল কিলার। আমি পদোন্নতির পক্ষে নই। তুমি পদোন্নতির সভায় বিষয়টি এভাবে উপস্থাপন করবে এবং তিনি সভায় এভাবেই প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন। তবু বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য তাকে ভালো অফিসার হিসেবে অভিহিত করে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করেন।’

সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, জিয়াউল আহসান কখনোই ভালো কর্মকর্তা ছিলেন না।

সেনাবাহিনীতে সাধারণত স্টাফ কলেজ করা ছাড়া কাউকে লে. কর্নেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় না। তিনি স্টাফ কলেজ করার যোগ্যতা কখনো অর্জন করেননি। এমনকি স্টাফ কলেজও করেননি। এছাড়া লে. কর্নেল হিসেবে তিনি কোনো ব্যাটালিয়ন কমান্ড করেননি। এজন্য তিনি কর্নেল পদে পদোন্নতির যোগ্য ছিলেন না।

ইকবাল করিম ভূঁইয়া উল্লেখ করেন, জেনারেল মোমেন পদোন্নতি সভায় জিয়ার ব্যাপারে উপস্থাপন করার কিছুদিন পর তাকে (মোমেন) সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে প্রেষণে বাহরাইনের রাষ্ট্রদূত করা হয়। সেনাবাহিনীতে এ ধরনের পোস্টিংকে ডাম্পিং পোস্টিং বলা হয়।

এর আগে ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি জবানবন্দি পেশ করেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। এর আগে ১৪ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ১০৪ জনকে হত্যার ঘটনায় তার ‍বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠন করা হয়। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পক্ষের প্রসিকিউশনের আনা তিনটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।

প্রসিকিউশনের মতে, ২০০৯-২০১৬ সময়কালে জিয়াউল আহসান র‍্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক এবং এডিজি (অপস্) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এসময়ে অসংখ্য বলপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন, অগণিত হত্যাকাণ্ড, গুমসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধে তার সরাসরি নির্দেশ, অনুমোদনক্রমে, জ্ঞাতসারে তার বিশ্বস্ত র‍্যাব সদস্যরা সংঘটন করতো।

প্রসিকিউশন মতে, ২০০৯ সালে সেনাবাহিনীর মেজর অবস্থায় র‍্যাবে পোস্টিং পাওয়ার পর থেকে আসামি জিয়াউল আহসান বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ফলে ২০২৪ সালে মেজর জেনারেল হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসরের আগ পর্যন্ত তাকে কখনোই মাতৃবাহিনী তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফেরত যেতে হয়নি। হাসিনার পুরো আমলে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন বাহিনী বা সংস্থায় কাজ করেছেন। পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় কোর্স বা প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করে এবং কোনো ব্যাটালিয়ন, ব্রিগেড বা ফর্মেশন কমান্ডের অভিজ্ঞতা ছাড়াই আসামি জিয়াউল মেজর জেনারেল পর্যন্ত পদোন্নতি পান, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবময় পেশাদারত্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।

এফএইচ/এমআইএইচএস/