মতামত

শপথের দিনেই ভিন্নপথ, তারপর কী

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রতীক্ষিত সরকারের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো ব্যতিক্রমী শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। তাঁর নেতৃত্বাধীন তারুণ্যের মন্ত্রী পরিষদকে গতানুগতিকতার বাইরে না বলা গেলেও চিন্তা-ভাবনার ছাপ আছে। একজন মন্ত্রীর নিয়োগ নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে এমন বলা হলেও নিকট অতীতেও আলোচনায় ছিলো নির্বাচনি রাজনীতির নাটাইটা বাংলাদেশের বাইরে। অনুমানটা সত্যের কাছাকাছি হয়ে যায় মন্ত্রী পরিষদের শপথ অনুষ্ঠানের পর।

আর শপথ অনুষ্ঠানের দিনই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে দেয়, আসলে সংসদের আবহাওয়াটা অন্য সংসদ থেকে অনেক গরমই হবে। চলবে ঝড়-তুফানও। সেখানে সরকারি দল বিরোধী দলের ফারাক যেমন কাজ করবে তেমনি আদর্শিক দিকও কাজ করবে। দুই পক্ষই জুলাই অভ্যুত্থানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবে। তার আলামতও দেখা গেলো ইতোমধ্যে। বিশেষ করে শপথ অনুষ্ঠানের সময় সরকারি দল ও বিরোধী দলের যে মত পার্থক্যটা দেখা গেলো তা যে কাউকে না ভাবিয়ে পারে না।

নির্বাচনের আগে থেকেই অনুমান করা গিয়েছিলো জুলাই সনদ নিয়ে একটা ক্যাচাল বাজতে পারে। সেরকমই ইঙ্গিত বিএনপি আগে থেকেই দিয়ে আসছিলো।শপথের দিন সেটা স্পষ্ট হয়ে গেলো।সরকারি দল সংবিধানকে উপজীব্য করে শপথ কাজ সম্পন্ন করে সরকার গঠন করলো। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দল সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ গ্রহণ করে।

সরকারি দলের দাবি সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয় কিংবা তাদের শপথ অনুষ্ঠানের বিষয়ে কিছুই উল্লেখ নেই সংবিধানে। সেইজন্য তারা সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। এর পেছনে তারা যুক্তি দেখাতে গিয়ে যে ভাষার আশ্রয় নিয়েছে তা অনেকটাই কৌশলী শব্দের মারপ্যাঁচে ভর্তি। সেই যদি, হয়, কিন্তু, তবে এমন। তারা বলেননি তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে সেই হিসেবে পরবর্তী সময় শপথ গ্রহণ করবেন। আবার এটাও বলেননি তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হতে রাজি নন। তবে পদ্ধতি-প্রক্রিয়ায় আইনি বিষয়টি যেভাবে তারা তোলে ধরেছেন, তাকে সরলভাবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কম।

অনুমান করা যায়, সংস্কার কমিশনসমূহের দেওয়া অভিন্ন প্রস্তাবগুলো তারা সংসদের প্রথম দিকেই সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে নেবেন। আর সেখানেও তারা প্রাধান্য দিতে পারেন ৩১ দফা ভিত্তিক তাদের ইশতেহারকে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবেও তাদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো রয়েছে। কিন্তু নোট অব ডিসেন্ট বিষয়টি নিয়ে সংসদে বড় রকমের মতভেদ তৈরি হবে এটা নিশ্চিত। তবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু হয়ে যাবে এটা নিশ্চিত বলা যায়। সেটাও বিএনপির ইশতেহারের আলোকেই হবে। যথাযথভাবে সংবিধানের সংশোধন মাধ্যমে সংবিধানের আলোকে।

রাজনৈতিক দলগুলোকে ভাবতে হবে, সংবিধান সংস্কার যেমন রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একইভাবে কড়লার কেজি ২৮০ টাকা, লেবুর হালি ১৬০ টাকা, শসার কেজি ১৫০ টাকা বিষয়টাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রমজানে মানুষকে সংবিধান সংসদ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করতে গেলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনটাও নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয় ঐকমত্য প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ দলের চাওয়া প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে সদস্য মনোনীত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে হয়। আর এখানেই ১১ দলীয় জোটের সদস্যরা বেঁকে বসবেন। তাঁরা চাইবেন ওইভাবে উচ্চকক্ষ গঠিত হোক যেখানে পার্লামেন্টে নির্বাচিত না হওয়ার পরও যেন উচ্চকক্ষে সদস্য হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। যদিও এবারে ভোটের যে আনুপাতিক হার তৈরি হয়েছে এতে বিএনপি ও জামায়াতের পর বাকি দলগুলোর ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে খুবই সামান্য।

বিএনপি শপথ অনুষ্ঠানেই জানিয়েছে তারা সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে নন। তাই শপথ করতে হলে সংবিধান সংশোধন করে সেই অনুযায়ী হতে হবে। একদিক দিয়ে বিবেচনা করলে তাদের যুক্তি শক্তিশালী। এতে করে ভবিষ্যতে প্রশ্ন করার সুযোগ কম থাকবে। কিন্তু বিরোধী দল যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে প্রশ্ন আসতেই পারে। প্রশ্ন আসতে পারে গণভোটের বৈধতা নিয়েই। সংসদ সদস্য ও দলগুলোর বাইরে সেই আলামত স্পষ্ট হয়ে গেছে শপথ অনুষ্ঠানের দিনই। হাইকোর্টে রিট হয়েছে গণভোটের বৈধতা নিয়ে। রায় কী হবে তা অজানা। কিন্তু সংবিধান যে গণভোট বিষয়ে রূপরেখা দিয়েছে সেটা বাদ দেওয়ার সুযোগ কম।

আমি আইনের ছাত্র নই। কিন্তু যখন গণভোটের পক্ষের দলগুলোকে বলতে শুনি জনগণের অভিপ্রায়ে গণভোট হয়েছে তখন সাধারণ মানুষ হিসেবে প্রশ্ন জাগে জনগণের অভিপ্রায় হচ্ছে নির্বাচিত সংসদে সমর্থিত বিধান। এমন কোনো সমর্থন কি জনগণ দিয়েছে? প্রাসঙ্গিকভাবে একটি পক্ষ গণ-অভ্যুত্থানের কথা বলবেন। অভ্যুত্থানই এই সংবিধানকে ধারণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেছে এবং নির্বাচনও হয়েছে সংবিধানের আলোকে। এমনকি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের শপথও হয়েছে সংবিধানের আলোকে। যে সংবিধান হচ্ছে জনগণের অভিপ্রায়। এবং গণঅভ্যুত্থানেও স্বীকৃত। সুতরাং সংবিধানের বাইরে কিছু গ্রহণ বর্জন করা কি যৌক্তিক বলে মনে হতে পারে? আবার এটাও বলা যাবে না জুলাই সনদকে চাপা দেওয়াটা যথাযথ হবে।

এই মুহূর্তে সরকারি ও বিরোধী দল যে কাজটা করতে পারতো তা হচ্ছে-জুলাই সনদের বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। সেই অনুযায়ী জরুরি প্রয়োজনে আইন বাস্তবায়নের সময়কে নিকট অতীতে টেনে নিয়ে যাওয়া। তারপর জুলাই সনদে যে-সব বিষয়ে দ্বিমত আছে সেগুলো সংসদে আলোচনায় দেওয়া এবং যুক্তি তর্ক দিয়ে সেগুলো বিষয়ে উপসংহারে পৌঁছা। এটাই হতে পারে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।

মনে রাখা দরকার এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে দ্রুত সংসদকে কার্যকর করা। সেখানে বসে পক্ষে বিপক্ষের সবাই আলোচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এই পথে না গিয়ে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে ভবিষ্যতে শুধু প্রশ্নের মুখেই পড়তে হবে না, সমস্ত পরিশ্রমই বৃথাও হয়ে যেতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোকে ভাবতে হবে, সংবিধান সংস্কার যেমন রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একইভাবে কড়লার কেজি ২৮০ টাকা, লেবুর হালি ১৬০ টাকা, শসার কেজি ১৫০ টাকা বিষয়টাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রমজানে মানুষকে সংবিধান সংসদ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করতে গেলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনটাও নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

এইচআর/এমএস