‘প্রিয় এলাকাবাসী, আসসালামু আলাইকুম। পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে ঢাকা-৭ আসনের আপামর জনসাধারণের কথা চিন্তা করে সম্মানিত ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ। অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) মধ্যদুপুরে পুরান ঢাকার আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড চৌরাস্তার সামনে ব্যাটারিচালিত রিকশায় বসে এক ব্যক্তিকে এমন মাইকিং করতে দেখা যায়।
উৎসুক পথচারীদের অনেকে থেমে কান পেতে শোনেন ঘোষণা। রমজানের শুরুতেই বাজারদর, মুনাফা আর নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে মানুষের কৌতূহল যেন মাইকের শব্দে গুঞ্জরিত।
লালবাগের বাসিন্দা হোসেন মিয়া বলছিলেন, ‘মাইকে খালি ঘোষণা দিলে চলবে না। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত খোঁজখবর নিতে হবে। না হলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ শুধু ঘোষণাতেই রয়ে যাবে।’
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, আজিমপুর এতিমখানার সামনের ফুটপাতের এক দোকানের ব্যানারে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬৫০ টাকা লেখা দেখে ভেতরে ঢোকেন। কিন্তু দোকানের ভেতরে সাদা কাগজে লেখা ৭০০ টাকা। এক কেজি কিনে ৭০০ টাকা দিলে দাবি করা হয় ৭২০ টাকা।
‘রমজান উপলক্ষে ২০ টাকা কেজিতে বাড়ানো হয়েছে’,—এমন ব্যাখ্যা দেন বিক্রেতা; বাইরের সাইনবোর্ডটি ‘অনেকদিন আগের’ বলেও বুঝিয়ে দেন।
হোসেন মিয়ার দীর্ঘশ্বাস, ‘যে বেতন পাই, তাতে সংসার চালানোই কষ্ট। তাই একটু কম দামে পণ্য কিনতে চেষ্টা করি।’
হোসেন মিয়া একা নন। রমজানের প্রথম দিনেই রাজধানীর অনেকেই তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামের খোঁজে ফুটপাত, অস্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র কিংবা ছোট-বড় মার্কেটে ছুটে যান।
আজিমপুর ফরিদ উদ্দিন সিদ্দিকী স্কুলের সামনে একটি পিকআপে দেখা গেলো ‘সুলভ মূল্যে’ বিক্রি। এক লিটার দুধ ৮০ টাকা, এক ডজন ডিম ৯৬ টাকা, এক কেজি ড্রেসিং করা ব্রয়লার মুরগি ২৪৫ টাকা, আর এক কেজি গরুর মাংস ৬৫০ টাকা।
অপেক্ষাকৃত কম দামে পণ্য কিনতে নারী-পুরুষের ছোট্ট লাইন। সুলতানা বেগম নামে এক নারী বললেন, ‘বাজারের তুলনায় দাম কিছুটা কম। তাই ডিম আর মুরগি নিচ্ছি।’
বিক্রেতার দাবি, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।
ধানমন্ডির নিউমার্কেটের পাশে ফুটপাতে অর্ধশতাধিক মানুষ অপেক্ষায়। এখানকার বাসিন্দা আব্দুস সালাম জানালেন, ‘সরকারি ট্রাক এলে চাল-ডাল-তেল কিনবো। আমরা কেউ কার্ডধারী নই, তবে বাজারের চেয়ে দাম কম—তাই অপেক্ষা।’
রমজানের প্রথম দিনে এই অপেক্ষা যেন শহুরে জীবনের আরেক প্রতিচ্ছবি—আশা আর সাশ্রয়ের সন্ধানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ।
লালবাগ ও ধানমন্ডি এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, সকালবেলায় রাস্তাঘাটে লোকজনের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় জমে।
ফুটপাতের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁয় ইফতারসামগ্রীর প্রস্তুতি চোখে পড়ে। মুড়ি, জিলাপি, আঙুর, পেঁপে, বরই, আপেলসহ নানা ফলের ছোটখাটো পসরা সাজাতে ব্যস্ত বিক্রেতারা। একজন দোকানি বললেন, ‘বিকেলের দিকে ইফতারের বাজার জমে উঠবে।’
রমজানের প্রথম দিন তাই রাজধানীতে মিশ্র ছবি—ঘোষণার মাইক, দরকষাকষির গল্প, সুলভ দামের লাইনে অপেক্ষা আর বিকেলের ইফতার বাজারের প্রস্তুতি। আত্মশুদ্ধির মাসে মানুষের প্রত্যাশা একটাই—স্বস্তির বাজার, সহনীয় দাম, আর নিত্যদিনের জীবনে একটু স্বাচ্ছন্দ্য।
এমইউ/বিএ