লাইফস্টাইল

রোজায় ওজন সামলে পুষ্টিকর খাবারের উপায় জানালেন বিশেষজ্ঞ

রমজান মানেই শুধু ইবাদত নয়, এটি হতে পারে শরীর ও মনের পুনর্গঠনের একটি বৈজ্ঞানিক সুযোগ। অনেকেই মনে করেন রোজা রাখলে স্বাভাবিকভাবেই ওজন কমে যাবে। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেন মাস শেষে ওজন বেড়ে যায়।

বাস্তবতা হলো, সচেতন পরিকল্পনা থাকলে রমজান মাসেই সুস্থভাবে শরীরের সব পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে ধীরে ও স্থায়ীভাবে ওজন কমানো সম্ভব।

রোজার দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে শরীরে গ্লাইকোজেন ভান্ডার কমে যায়। তখন শরীর শক্তির জন্য সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার করতে শুরু করে যা ওজন কমানোর একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ইফতারে অতিরিক্ত ক্যালরি, ভাজাপোড়া ও মিষ্টিজাতীয় খাবার খেলে সেই সুবিধা নষ্ট হয়ে যায়। রক্তে গ্লুকোজ হঠাৎ বেড়ে গিয়ে ইনসুলিন বৃদ্ধি পায় এবং অতিরিক্ত শক্তি চর্বি হিসেবে জমা হয়।

সুতরাং প্রথম শর্ত-ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু অপুষ্টি নয়।

ইফতারে যা খাবেন

ইফতার শুরু করুন ১টি খেজুর ও এক গ্লাস পানি দিয়ে। শরবত হিসেবে নিতে পারেন ইশপগুল ভুশির পানি, কচি ডাবের পানি। এরপর বেছে নিন উচ্চ আঁশ ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেমন - ছোলা, অল্প ফল, টকদই, ডাল বা স্যুপ। এগুলো রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখে এবং দ্রুত তৃপ্তি দেয়। ভাজাপোড়া খাবার প্রতিদিন না খেয়ে সীমিত রাখুন।

রাতের খাবার কি দরকার?

অনেকেই ইফতারে ভারী খাবার খেয়ে ভাবেন রাতে না থেকে সরসিরি সেহরি করবেন। কিন্তু এটি আসলে ভালো অভ্যাস না। তার চেয়ে হালকা ইফতারের দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর সুষম রাতের খাবার বেশি স্বাস্থ্যকর।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্লেট কল্পনা করুন। অর্ধেক সবজি, এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন (মাছ, মুরগি, ডাল বা ডিম) এবং এক-চতুর্থাংশ জটিল শর্করা (লাল চালের ভাত, আটার রুটি বা ওটস)। এতে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল, প্রোটিন ও ফাইবার একসঙ্গে পাওয়া যায়, আবার অতিরিক্ত ক্যালরি জমে না।

তাহলে সেহরিতে কী খাবেন?

সেহরি হলো দিনের শক্তির ভিত্তি। অনেকেই শুধুমাত্র ভাত বা দুধ-কলায় সেহরি সারেন, যা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে আবার কমিয়ে দেয়। সেহরিতে জটিল কার্বোহাইড্রেট (লাল চালের ভাত বা চিড়া, লাল আটা রুটি বা ওটস বা চাম্পা কলা), প্রোটিন (ডিম, মাছ মুরগি, ডাল, দুধ, দই), স্বাস্থ্যকর চর্বি (৬ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখা বিভিন্ন বাদাম, বিভিন্ন সিডস বা চিয়া বীজ) এবং সবজি রাখুন। এতে দীর্ঘসময় পেট ভরা থাকবে, ক্লান্তি কমবে এবং অতিরিক্ত ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ধীরে ধীরে ১০-১২ গ্লাস পানি পান করুন। চিনি বা কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন। পর্যাপ্ত পানি বিপাকক্রিয়া সক্রিয় রাখে এবং অপ্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণ কমাতে সাহায্য করে।

রমজানে কি শরীরচর্চা করবেন না?

স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ রমজানেও শরীরচর্চা অব্যাহত রাখবেন। শুধু সময়সূচি পরিবর্তন হবে। ইফতারির ঠিক আগ মুহূর্তে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটতে পারেন। যাদের কোন শারীরিক জটিলতা নেই, ইফতারের এক ঘণ্টার পর ৩০ মিনিট ব্যায়াম করতে পারেন। এরপর তারাবির নামাজ পড়বেন। এতে ক্যালরি বার্নের সঙ্গে ইবাদতও হবে।

সেহেরির এক ঘন্টা আগে ৫০ থেকে ৬০ মিনিট শরীরচর্চা করবেন। সকল ধরনের শারীরিক জটিলতা এড়াতে রোজা রেখে সকাল বা ভোর বেলা থেকে বিকাল পর্যন্ত শরীরচর্চা করা থেকে বিরত থাকুন।

ওজন কমাতে প্রোটিনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত প্রোটিন পেশিকে সংরক্ষণ করে এবং মেটাবলিজম সচল রাখে। রোজায় যদি শুধু কার্বোহাইড্রেট নির্ভর খাবার খান, তাহলে পেশি ক্ষয় হতে পারে এবং ওজন কমলেও তা স্বাস্থ্যকর হয় না। তাই প্রতি প্লেটেই প্রোটিন রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

হালকা শারীরিক কার্যক্রমও জরুরি। ইফতারের পর ২০-৩০ মিনিট হাঁটা রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক এবং চর্বি পোড়াতে সাহায্য করে। নিয়মিত ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ। অপর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে।

মনে রাখতে হবে, রমজানে লক্ষ্য হওয়া উচিত - প্রয়োজনীয় পুষ্টি বজায় রেখে সামান্য ক্যালরি ঘাটতি তৈরি করা। এতে প্রতি সপ্তাহে ধীরে ধীরে ওজন কমবে, শরীর দুর্বল হবে না।

যাদের ওবিসিটি, অতিরিক্ত ওজনসহ আরও বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে তারা অবশ্যই পুষ্টিবিদের পরামর্শে ব্যক্তিগত খাবার তালিকা মেনে চলবেন।

রমজান আমাদের শেখায় সংযম। সেই সংযম যদি খাদ্য নির্বাচন ও পরিমাণে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে রমজানই হতে পারে সুস্থভাবে ওজন কমানোর আদর্শ সময়। সঠিক পরিকল্পনায় রোজা শুধু আত্মার পরিশুদ্ধিই নয়, শরীরের ভারসাম্যও ফিরিয়ে আনতে পারে।

চিকিৎসক পরিচিতি: পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ইফাতসিনিয়র ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ানবাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার ক্লিনিক এবং বায়োজিন কসমেসিউটিক্যালস ধানমন্ডি, ঢাকা।

এএমপি/এএসএম