তথ্যপ্রযুক্তি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাংলা ভাষা: আমরা কতটা প্রস্তুত?

তানজিদ শুভ্রবায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে নিজের ভাষার অধিকার আদায় করতে হয়। রক্ত দিয়ে কেনা সেই বাংলা ভাষা আজ নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। লড়াইয়ের ময়দানটা এখন আর রাজপথ নয়, বরং ডিজিটাল দুনিয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। প্রশ্ন হলো, এআইয়ের এই রকেটের গতিতে এগিয়ে চলার যুগে আমাদের বাংলা ভাষা কতটা প্রস্তুত?

চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো টুলের সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত। এগুলোকে বাংলায় কোনো প্রশ্ন করলে বেশ সুন্দর করে উত্তর দিয়ে দেয়। চাইলে কবিতাও লিখে দেয়। কিন্তু একটু গভীরভাবে খেয়াল করলেই বোঝা যায়, এই যন্ত্রগুলোর বাংলা ভাষা এখনো পুরোপুরি সাবলীল নয়। অনেক সময় এরা এমন সব শব্দ ব্যবহার করে যা আমরা দৈনন্দিন জীবনে বলি না। আবার মাঝে মাঝে ভুল তথ্যও দিয়ে বসে। এর কারণ হলো যন্ত্র নিজে থেকে কিছু বোঝে না, সে শুধু তাকে দেওয়া তথ্য থেকে শেখে।

এআইয়ের মূল চালিকাশক্তি হলো তথ্য। ইংরেজিতে ইন্টারনেটে যত বিশাল পরিমাণ তথ্য আছে, বাংলায় তার খুব সামান্যই আছে। ইন্টারনেটে আমরা প্রতিদিন যে বাংলা লিখি তার বড় অংশই হয়তো বানান ভুলে ভরা বা ইংরেজি বর্ণে লেখা বাংলা। ইন্টারনেটে মানসম্মত ও শুদ্ধ বাংলার ভাণ্ডার বেশ ছোট। ভালো তথ্যের অভাবে এআই কখনো ভালো বাংলা শিখতে পারবে না। পুরোনো সাহিত্য, বই বা পত্রিকাগুলো এখনো পুরোপুরি ডিজিটাল আর্কাইভে রূপান্তরিত হয়নি। ফলে যন্ত্রকে শেখানোর মতো ভালো উপকরণের বেশ অভাব রয়েছে।

আমরা যেভাবে বইয়ে পড়ি আর যেভাবে মুখে কথা বলি তার মধ্যে বেশ পার্থক্য আছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব সুন্দর আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে। মানুষের মুখের এই বৈচিত্র্যময় ভাষা যন্ত্রের জন্য বোঝা বেশ কঠিন। ভয়েস কমান্ড বা মুখে বলে টাইপ করার প্রযুক্তিতে বাংলা বেশ এগিয়েছে ঠিকই, তবে আঞ্চলিক টান বা মুখের স্বাভাবিক কথার ধরন বুঝতে এআই এখনো অনেক পিছিয়ে আছে।

এই সমস্যার সমাধান শুধু প্রযুক্তিবিদদের হাতে নেই। আমাদের সবার এখানে ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা ব্লগে শুদ্ধ বাংলায় লেখার চর্চা বাড়াতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বাংলার বড় এবং মানসম্মত তথ্যের ভাণ্ডার তৈরির কাজ আরও দ্রুত করতে হবে। প্রযুক্তি নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের এই ভাষার প্রযুক্তিগত কাঠামোর দিকে আরও নজর দিতে হবে।

প্রযুক্তি নিজের গতিতে এগিয়ে যাবে। সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাকেও এগিয়ে নিতে হবে। ভাষার মাসে শুধু আবেগ দেখালেই চলবে না। প্রযুক্তিগতভাবে ভাষাকে সমৃদ্ধ করার কাজে মনোযোগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আগামী প্রজন্মের কাছে বাংলাকে টিকিয়ে রাখতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতেও বাংলার শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুনডিজিটাল ডিভাইস শিশুর জন্য যেন মরণফাঁদব্যবহারকারীকে ভুল স্বাস্থ্য তথ্য দিয়ে বিতর্কে গুগল এআই

কেএসকে