জাতীয়

যে শহীদদের অবদান স্মরণে দিবস, তাদেরই শেষ ঠিকানা অবহেলায়

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ২০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকেই নামে মানুষের ঢল। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিদের অর্পিত ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ মিনারের বেদি।

কিন্তু যাদের স্মরণে এই শ্রদ্ধা, তাদের শেষ ঠিকানার খবর জানি না আমরা অনেকেই। ভাষা শহীদ আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার, শফিউর রহমান, রফিকউদ্দিন আহমেদ ও আব্দুস সালাম- এই পাঁচজন চিরনিদ্রায় শায়িত আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে।

এই কৌতূহল থেকেই এ বছর সেখানে যান প্রতিবেদক।

শনিবার, বেলা সাড়ে ১১টা। আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানের দক্ষিণ গেট পেরিয়ে কিছুদূর এগোলেই বাম পাশে ভাষা শহীদদের কবরস্থান। সাদাকালো মার্বেলে খোদাই করা নামগুলোর দিকে তাকালে মনে পড়ে ১৯৫২ সালের উত্তাল দিনগুলোর কথা- রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো তরুণদের স্বপ্ন, প্রতিবাদ আর শেষ পর্যন্ত রক্তে রঞ্জিত পথচলা। ইতিহাস বইয়ের পাতা যেন হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাস্তব হয়ে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাঁচ শহীদের মধ্যে বরকত, শফিউর রহমান ও আব্দুল জব্বারের কবরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের পক্ষ থেকে একটি করে ফুলের ডালি রাখা হয়েছে। কিন্তু রফিক ও সালামের কবরের স্পষ্ট কোনো চিহ্ন চোখে পড়েনি।

কবরের আশপাশে হাতে গোনা দু-একজন ছাড়া আর কাউকে দেখা যায়নি। সেখানে উপস্থিত ফারুক আহমেদ নিজেকে ‘আব্দুস সালাম ফাউন্ডেশন’-এর সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে বলেন, ওই যে গাছটি দেখছেন তার দুপাশেই রফিক ও সালামের কবর। কয়েক বছর আগে পুনর্নির্মাণের জন্য পুরোনো চিহ্ন ভেঙে ফেলা হয়। কিন্তু ৮-১০ বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন করে নির্মাণ আর হয়নি।

তিনি জানান, আগে ভাষা শহীদদের কবরগুলো লাল রঙের ছিল। বিভিন্ন সময় সিটি করপোরেশনের দ্বারস্থ হলেও বাজেট বরাদ্দ না থাকায় পুনর্নির্মাণ সম্ভব হয়নি। অন্যান্য বছর অনেকেই ফুল দিতে আসতেন, এ বছর তেমন ভিড় নেই। সরকারি উদ্যোগ না থাকলেও নিজেদের উদ্যোগে কবরের চিহ্ন পুনর্গঠনের আশাবাদও ব্যক্ত করেন।

কেউ আসুক বা না আসুক, কবরের চিহ্ন থাকুক বা না থাকুক- আজিমপুরের এই মাটিতে শায়িত সমাধিগুলো কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এগুলো স্মৃতির স্থায়ী ঠিকানা, জাতিসত্তার মাইলফলক। এখানে নেই মাইকের শব্দ, নেই আনুষ্ঠানিক বক্তৃতাও।

একুশের উজ্জ্বল আলোয় যখন শহীদ মিনার ফুলে আর শ্রদ্ধায় ভরে ওঠে, তখন আজিমপুরের এই নীরবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- এই শ্রদ্ধা যাদের প্রতি, যাদের জন্য, তাদের শেষ ঠিকানাকে কি আমরা সে সংস্কার বা সম্মানটুকু দিতে পেরেছি যেটা তারা নিজেরা বেঁচে থাকলে জনগণের কাছ থেকে পেতেন?

এমইউ/এএমএ