অর্থনীতি

ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে সরগরম কাপড়ের পাইকারি মার্কেট ইসলামপুর

পুরান ঢাকার ইসলামপুর। দেশের মধ্যে কাপড়ের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারটি বছরজুড়েই ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে সরগরম থাকে। ঢাকাসহ সারা দেশের ব্যবসায়ীরা এখান থেকে পাইকারি দরে থান কাপড় ও তৈরি পোশাক কিনে থাকেন। বিশেষ করে দুই ঈদ কেন্দ্র করে এখানে কেনাবেচা হয় সবচেয়ে বেশি। এরই ধারাবাহিকতায় এবারের ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ইসলামপুরে জমে উঠেছে কেনাবেচা। রংপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ভিড় করছেন এই মার্কেটে।

প্রতি বছরের মতো এবারও রমজান শুরুর প্রায় এক মাস আগে থেকেই বেচাকেনা শুরু হয় ইসলামপুর মার্কেটে। সময় যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণ। ইসলামপুর মূলত কাপড়ের পাইকারি ব্যবসার জন্য পরিচিত। থ্রি-পিস, শাড়ি, লেহেঙ্গা, পাঞ্জাবি, শিশুদের পোশাক, তৈরি গার্মেন্টস আইটেমসহ সব ধরনের পণ্যের নতুন নতুন সংগ্রহে (কালেকশন) এখন দোকানভর্তি। ঈদ উপলক্ষে ফ্যাশন ও ডিজাইনে এসেছে বৈচিত্র্য। পাকিস্তানি, ভারতীয় ও দেশীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অনুকরণে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি দেশীয় কারিগরদের তৈরি বিশেষ ডিজাইনও দৃষ্টি কাড়ছে ক্রেতাদের।

ইসলামপুর মার্কেটের কাপড়ের দোকান/ছবি: জাগো নিউজ

ব্যবসার সার্বিক চিত্র নিয়ে যা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা

রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে মার্কেটের বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা যায়, ঈদকেন্দ্রিক বেচাকেনা জমে উঠেছে। নতুন কালেকশনের চাহিদা, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতাদের আগমন ও পছন্দমতো মালামাল সংগ্রহের তোড়জোড়ে জমজমাট পরিবেশ বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

আরও পড়ুননিউমার্কেটে জমে উঠছে ঈদের কেনাকাটাছুটির দিনে যমুনা ফিউচার পার্কে জমজমাট ঈদের কেনাকাটাইসলামপুরে ঈদের বাজারে ব্যস্ততা, দাম বাড়তি

ক্রেতা-বিক্রেতা ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি মৌসুমে বিক্রি সন্তোষজনক। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নয়ন, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ এবং সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ইসলামপুরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

ইসলামপুর কাপড় ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য আব্দুল মালেক জাগো নিউজকে বলেন, রমজানের আগেই পাইকারি বেচাকেনা জমে ওঠে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন শত শত ব্যবসায়ী আসছেন। আমাদের দোকানগুলোতে নতুন কালেকশনের চাহিদা বেশি।

পুরান ঢাকার ইসলামপুর পাইকারি মার্কেটে কাপড়ের দোকানে ব্যস্ততা/ছবি: জাগো নিউজ

স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা হাফিজুর রহমান বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার বিক্রি কিছুটা ভালো। তবে পরিবহন ব্যয় ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় আমাদের খরচও বেড়েছে। তারপরও ঈদকে সামনে রেখে ব্যবসা সচল আছে।

ইসলামপুরের গুলশানারা সিটি মার্কেটের পুম্পা গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম বলেন, অনেকে একবারে বড় পরিমাণে মালপত্র কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার কারও সংগ্রহ শেষ হয়ে গেলে পুনরায় এসে কিনছেন। এভাবে বাজারে লেনদেনের গতি বজায় আছে।

নতুন কালেকশন সংগ্রহে খুচরা ব্যবসায়ীদের ভরসা ইসলামপুর

বাণিজ্যিক এলাকাটির ছোট-বড় প্রায় সব দোকানেই ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। রাজশাহী থেকে আসা খুচরা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আমি গত মাসেও মাল নিয়ে গেছি। এখন আবার স্টক শেষ হয়ে আসায় নতুন করে কিনতে এসেছি। ইসলামপুরে একসঙ্গে সব ধরনের ডিজাইন পাওয়া যায়, তাই বারবার আসতে হয়।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সুমি আক্তার বলেন, এখানে দামের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে। তাই আমরা পাইকারি দামে ভালো পণ্য পাই। ঈদের আগে গ্রাহকের চাহিদা বাড়বে, তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।

আরও পড়ুন

ফুটপাতের দোকানগুলোতে ঈদের আমেজ, কেনাকাটার ধুম

খুলনা থেকে আসা আরেক ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, এই বাজারের ওপর আমাদের অনেকটা নির্ভর করতে হয়। নতুন কালেকশন দ্রুত পেতে হলে ইসলামপুরই ভরসা।

পাইকারি কেনাবেচার ক্ষেত্রে মালামাল পরিবহন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেকে সরাসরি ট্রাক বা পিকআপে করে মাল নিয়ে যান। আবার অনেকে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য পাঠান দেশের বিভিন্ন জেলায়। বাজারসংলগ্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক পরিবহন ও কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান।

ইসলামপুর মার্কেটের কাপড়ের দোকান/ছবি: জাগো নিউজ

ব্যবসায়ীরা জানান, বড় অর্ডারের ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ কমাতে সমন্বিতভাবে মালামাল পাঠানো হয়। ছোট ব্যবসায়ীরা কুরিয়ার সার্ভিসের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এতে সময়ও বাঁচে, ঝামেলাও কম হয়।

যানজট ও ঘিঞ্জি পরিবেশে ভোগান্তি

তবে ব্যবসার এই জোয়ারের মধ্যেও রয়েছে কিছু সমস্যা। ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় ইসলামপুরে যানজট নিত্যদিনের চিত্র। সরু সড়ক, ফুটপাত দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায়ই ভোগান্তিতে পড়েন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা।

কুমিল্লা থেকে আসা ব্যবসায়ী আবদুল কাদের জাগো নিউজকে বলেন, মাল কেনার চেয়ে বাজারে ঢোকা-বের হওয়াটাই বেশি কষ্টকর। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়।

স্থানীয় দোকানদার মিজানুর রহমান বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর কিছুটা শৃঙ্খলা এসেছে। ট্রাফিক পুলিশ সক্রিয় আছে। তবে পুরোপুরি স্বস্তি এখনো আসেনি।

শফিকুল ইসলাম নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করা গেলে চলাচল অনেক সহজ হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি দরকার।

মার্কেট সংলগ্ন সংকীর্ণ সড়কে চলাচলে ভোগান্তিতে পড়তে হয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের/ছবি: জাগো নিউজ

ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মতে, বাজারে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত হয়েছে। পুলিশি টহল জোরদার হয়েছে। তবে ঈদের সময় জনসমাগম বাড়ায় চুরি-ছিনতাইয়ের আশঙ্কাও থাকে।

ইসলামপুর ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি আগের চেয়ে দৃশ্যমান। তবুও আমরা চাই ঈদ পর্যন্ত কঠোর নজরদারি বজায় থাকুক। ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা জরুরি। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা কাজ করছি।

ইসলামপুর এলাকাটির আংশিক ঢাকা-৬ আসনের মধ্যে পড়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন গতকাল শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ ও যানজট নিরসনে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন ইশরাক।

এমডিএএ/এমএমকে