আন্তর্জাতিক

নিজের নিয়োগ দেওয়া বিচারকদের হাতেই ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অস্ত্র ‘গ্লোবাল ট্যারিফ’ বা বৈশ্বিক শুল্ক নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। ৬-৩ ভোটের এই রায়ে আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, ১৯৭৭ সালের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ (আইইইপিএ) ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে এমন ব্যাপক শুল্ক আরোপ করতে পারেন না।

নিজ শিবিরে ‘বিদ্রোহ’: যারা বিপক্ষে ভোট দিলেন

এই রায়ের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া তিন বিচারপতির অবস্থান। ৯ সদস্যের সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের আমলে নিয়োগ পাওয়া তিনজন বিচারপতির মধ্যে দুইজনই প্রেসিডেন্টের এই নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তারা হলেন:

১. বিচারপতি নিল গোরসাচ: তিনি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ সালে নিয়োগ পেয়েছিলেন। রক্ষণশীল আদর্শের অনুসারী হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি সংবিধানের ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির ওপর জোর দিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেন।

২. বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট: ২০২০ সালে ট্রাম্পের হাতেই নিয়োগ পান তিনি। রিপাবলিকান ও রক্ষণশীল মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই বিচারপতিও রায়ের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ইচ্ছার চেয়ে আইনি ব্যাখ্যাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

আরও পড়ুন>>ট্রাম্পের ‘একতরফা শুল্ক’ অবৈধ: মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়সুপ্রিম কোর্টকেও পাত্তা দিচ্ছেন না ট্রাম্প, নতুন শুল্কের ঘোষণাট্রাম্পের নতুন শুল্কের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত

রায় ও রাজনৈতিক মেরুকরণ

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে বর্তমানে নয়জন বিচারপতির মধ্যে ছয়জন রিপাবলিকান এবং তিনজন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের মাধ্যমে মনোনীত:

রিপাবলিকান মনোনীত বিচারপতিরা হলেন (রক্ষণশীল):

জন রবার্টস (প্রধান বিচারপতি): জর্জ ডব্লিউ বুশ মনোনীত।ক্লারেন্স থমাস: জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ দ্বারা মনোনীত।স্যামুয়েল আলিটো: জর্জ ডব্লিউ বুশ দ্বারা মনোনীত।নিল গোরসাচ: ডোনাল্ড ট্রাম্প মনোনীত।ব্রেট কাভানা: ডোনাল্ড দ্বারা মনোনীত।অ্যামি কোনি ব্যারেট: ডোনাল্ড ট্রাম্প মনোনীত।

ডেমোক্র্যাট মনোনীত বিচারপতিরা হলে (উদারপন্থি):

সোনিয়া সোটোমায়র: বারাক ওবামা মনোনীত।এলেনা কাগান: বারাক ওবামা মনোনীত।কেটানজি ব্রাউন জ্যাকসন: জো বাইডেন মনোনীত।

শুল্কনীতি নিয়ে ট্রাম্পের বিপক্ষে যাওয়া ছয় বিচারপতির মধ্যে রয়েছেন:

* ট্রাম্প মনোনীত (রক্ষণশীল): নিল গোরসাচ ও অ্যামি কোনি ব্যারেট।* অন্যান্য রক্ষণশীল: প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস।* ডেমোক্র্যাট সমর্থিত: বিচারপতি সোনিয়া সোটোমায়োর, এলিনা কাগান এবং কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন।

আর ট্রাম্পের পক্ষে (শুল্কের সমর্থনে) ভোট দিয়েছেন অন্য তিন রক্ষণশীল বিচারপতি— ক্ল্যারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিতো এবং ট্রাম্প মনোনীত বিচারপতি ব্রেট কাভানো।

রায়ের মূল ভিত্তি

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত জানিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী কর বা শুল্ক আরোপের চূড়ান্ত ক্ষমতা কংগ্রেসের (আইনসভা), প্রেসিডেন্টের নয়। প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া

এই রায়ের পর প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমি এই আদালতের নির্দিষ্ট কিছু সদস্যের জন্য লজ্জিত। দেশের জন্য যা সঠিক তা করার সাহস তাদের নেই।’ বিশেষ করে বিচারপতি গোরসাচ ও ব্যারেটের সমালোচনা করে তিনি একে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে ইঙ্গিত দেন।

এই রায়ের ফলে ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ বড় ধরনের আইনি বাধার মুখে পড়লো। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন তিনি ভিন্ন এক আইনের অধীনে ফের শুল্ক আরো করবেন।

সূত্র: দ্য হিল, দ্য ডিসপ্যাচকেএএ/