ভ্রমণ

আধুনিক স্থাপত্যের দৃষ্টিনন্দন মসজিদ আল মুস্তফা

রাজধানী ঢাকাকে বলা হয় ‘মসজিদের শহর’। নগরীর আনাচে–কানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মসজিদ—যার প্রতিটি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাংলার সংস্কৃতির একেকটি জীবন্ত দলিল। প্রাচীন কারুকার্যমণ্ডিত স্থাপত্যশৈলীর মসজিদের পাশাপাশি বর্তমানে আধুনিক ও নান্দনিক বিদেশি নকশায় নির্মিত মসজিদও শোভা পাচ্ছে ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। তেমনই এক চোখধাঁধানো মসজিদের নাম মসজিদ আল মুস্তফা।

মসজিদটি রাজধানীর ১০০ ফিটে মাদানি এভিনিউয়ে ইউনাইটেড সিটিতে অবস্থিত। মসজিদ আল মুস্তফার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সামনের দিকে কালো রঙের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পবিত্র কাবা শরীফের আকৃতি। দেওয়ালে সোনালি রং দিয়ে লেখা হয়েছে আল্লাহ তাআলার পবিত্র নাম আল্লাহ এবং প্রিয় নবী হজরত মুহম্মদের (স.) নাম। যার সৌন্দর্য দূর থেকেই অবলোকন করা যায়। ভেতরে মেম্বরের দেওয়ালের ডিজাইনও একই। ওপরের দিকে বড় করে সোনালি রং দিয়ে লেখা হয়েছে ‌‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুল্লাহ (স.)’।

মসজিদ আল মুস্তফায় বেশ কিছু ব্যতিক্রমধর্মী ব্যবস্থা লক্ষ্য করা গেছে। এরমধ্যে অন্যতম নামাজের সারিতে কয়েকটি বেঞ্চ রাখা হয়েছে, যা সাধারণত অন্যান্য মসজিদে দেখা যায় না। এর ফলে কোনো মুসল্লি ক্লান্ত হলে সেখানে বসে বিশ্রাম নিতে পারেন। শুধু তা-ই নয়, প্রয়োজন হলে বেঞ্চে হেলান দিয়েও স্বস্তি অনুভব করা সম্ভব।

আরও পড়ুনশিবচরের দৃষ্টিনন্দন মসজিদ দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় 

পাঁচতলা বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো আলাদা কোনো জানালা নেই। স্থাপত্যশৈলী এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে, প্রাকৃতিক আলোতেই পুরো মসজিদ আলোকিত থাকে। ফলে ভেতরে এক মনোরম ও প্রশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া মসজিদের প্রতিটি তলা থেকেই ইমাম বা খতিবকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যা মুসল্লিদের জন্য নামাজ আদায়ে বাড়তি মনোযোগ ও সংযোগের অনুভূতি তৈরি করে। শুধু তাই নয়, নারীদের জন্য আছে আলাদা নামাজের ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে, পুরুষ ও নারী একসঙ্গে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ এই মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারেন।

মসজিদ আল মুস্তফায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধার এক চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। এখানে আছে দুটি চলন্ত সিঁড়ি, দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি এবং আধুনিক মানের কার্পেট দিয়ে সাজানো মেঝে। উন্নতমানের সাউন্ড সিস্টেম সংযোজন করা হয়েছে, যাতে খুতবা ও নামাজের বাণী স্পষ্টভাবে সবার কাছে পৌঁছে যায়।

একটি সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো মসজিদ শীতল রাখা হয়, যা মুসল্লিদের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করে। আকর্ষণীয় নকশায় নির্মিত হয়েছে অজুখানা, যেখানে একাধিক বেসিনের সুব্যবস্থা আছে। শুধু তাই নয়, মসজিদের নিচতলায় আছে বিশাল পার্কিংয়ের সুবিধা, যা আগত মুসল্লিদের জন্য বাড়তি স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে।

আরও পড়ুন৩৬৮ বছরের মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন শাহ সুজা মসজিদ 

মসজিদ আল মুস্তফার স্থাপত্যে দেখা মেলে অনন্য বৈশিষ্ট্য। সুউচ্চ ও বিশেষ নকশার একটি সোনালি গম্বুজ আছে, যা দূর থেকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গম্বুজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল উচ্চতার মিনার মসজিদের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদের চারপাশে রোপণ করা হয়েছে আরবের খেজুর গাছ, যা পরিবেশে ভিন্নমাত্রার আবহ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি আছে চোখজুড়ানো পানির ফোয়ারা। এ ছাড়া মসজিদের চারপাশের আধুনিক স্থাপনা নান্দনিকতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

দৃষ্টিনন্দন এই সৌন্দর্যের কারণে এটি এখন কেবল একটি মসজিদই নয় বরং একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এ মসজিদের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন। বিশেষ করে শুক্রবার বা ছুটির দিনে মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। এ ছাড়া রমজান মাসে মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। বিকেলের পর থেকে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারা আসতে শুরু করেন। মসজিদের নজরকাড়া অপরূপ সৌন্দর্যকে স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতে অনেকেই ছবি তোলেন এবং ভিডিও করেন। প্রতি রমজানেই বড় পরিসরে ইফতারের আয়োজন করা হয়। যেখানে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর এই উপাসনালয়ে হাজারো মুসল্লি একসঙ্গে ইফতার করেন। সব মিলিয়ে রমজানে উৎসবের মতো আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

মসজিদ আল মুস্তফার রাতের দৃশ্য সত্যিই মুগ্ধকর। যখন মসজিদের সব বাতি জ্বলে ওঠে; তখন পুরো প্রাঙ্গণ আলোকিত হয়ে ওঠে। এই পরিবেশ শুধু চোখে নয়, মনেও গভীর ছোঁয়া দেয়। রাতের নীরবতা, আলো এবং স্থাপত্যের সৌন্দর্য একত্রিত হয়ে মসজিদ আল মুস্তফা এক চোখধাঁধানো দৃশ্যে পরিণত হয়। এমন দৃশ্য মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের মনে সৎ পথে চলার অনুপ্রেরণা জাগায়। সততা ও বিবেকের আলোতে নতুন জীবন গড়ার প্রেরণা দেয়।

এসইউ