ঢাকা ওয়াসার এটিএম বুথের পানির দাম হুট করে বাড়ানো হয়েছে। আগে প্রতি লিটার পানি ভ্যাটসহ গ্রাহক কিনতেন ৮০ পয়সায়। রোববার (১ মার্চ) থেকে প্রতি লিটার কিনতে হচ্ছে ১০০ পয়সা করে, মানে প্রতি লিটার পানি এখন এক টাকা।
ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, ‘বর্তমানে এটিএম বুথ পরিচালনাসহ বৈশ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পানির দাম বাড়িয়েছে ওয়াসা। যদিও একই কথা বলে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট ঢাকা ওয়াসার এটিএম বুথের পানির দাম দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছিল। অর্থাৎ, ৪০ পয়সা লিটার পানির দাম এক লাফে ৮০ পয়সা করা হয়েছিল।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পানির দাম বাড়ানোর অফিস আদেশ জারি করেন ওয়াসা সচিব এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। ওই অফিস আদেশে বলা হয়, গত ২৮ জানুয়ারি ঢাকা ওয়াসার কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটির ১৪তম সভায় অপারেশন অ্যান্ড মেনটেনেন্স খরচ বাড়ায় ওয়াটার এটিএম বুথের প্রতি লিটার পানির মূল্য ০ দশমিক ৮০ (ভ্যাট+ট্যাক্সসহ) টাকা থেকে ১ টাকা (ভ্যাট+ট্যাক্সসহ) বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। যা ১ মার্চ থেকে কার্যকর হবে।
এভাবে দাম বাড়ায় আপত্তি জানিয়েছেন গ্রাহক। তাদের অভিযোগ, ওয়াসা একটি সেবা সংস্থা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। পানির দাম না বাড়িয়ে উল্টো এটিএমের পানিতে সরকারের ভর্তুকি দেওয়া দরকার। এতে সমাজের সব শ্রেণির মানুষ বিশুদ্ধ খাবার পানি পাবে। এখন বাসাবাড়িতে ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করে, সেগুলো ফুটিয়ে ঠিকমতো পান করা যায় না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. ইমরুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সম্প্রতি ঢাকা ওয়াসার বোর্ড সভায় এটিএম বুথের পানির দাম ২০ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্ত আজ রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে।’
পানির দাম বাড়ানো প্রসঙ্গে ইমরুল হাসান বলেন, ‘ওয়াসার এটিএম বুথ পরিচালনা ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে পানিতে যে কেমিক্যাল, ফিল্টার ব্যবহার করা হয় এগুলোর দাম বেড়েছে। জনবলের মজুরিও বেড়েছে। এ কারণে পানির দাম বাড়ানো হয়েছে।’
রোববার (১ মার্চ) সকালে মহাখালীর আইপিএইচে ঢাকা ওয়াসার ওয়াটার এটিএম বুথ থেকে দুই হাতে দুটি বোতলে ১০ লিটার পানি নিয়ে বের হন আরিফুল ইসলাম। তিনি পেশায় গুলশানের একটি মার্কেটের দোকানকর্মী। আলাপকালে আরিফুল ইসলাম বলেন, আগে মহল্লার কোথাও বিশুদ্ধ খাবার পানি পাওয়া যেত না। ওয়াসার লাইনের পানি ফুটিয়েই খাওয়া লাগতো। এখন সেই কষ্ট অনেকটাই কমছে। কিন্তু যেভাবে এটিএমের পানির দাম বাড়ছে, এটি গ্রহণযোগ্য নয়। ওয়াসা একটি সরকারি সেবা সংস্থা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। তাই গ্রাহক সুবিধাটা সবার আগে দেখতে হবে।
মহাখালী দক্ষিণপাড়ার এটিএম থেকে নিয়মিত পানি কেনেন মাজেদা বেগম। রোববার সকালে তিনি পানি কিনতে গিয়ে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি অন্য আরেকজনের কাছে জানতে পারেন। এনিয়ে তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
মাজেদা বেগম বলেন, খাবার পানিতেও সরকারের দাম বাড়াতে হবে কেন। দেশের কত জায়গায়, কতভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। এভাবে অন্তত খাবার পানিতে সরকার বা ওয়াসাকে ভর্তুকি দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, আমার আট সদস্যের পরিবার। দিনে গড়ে ১৫ লিটার খাবার পানি লাগে। এ হিসাবে মাসে প্রায় ৫০০ টাকার খাবার পানি কিনতে হয়। আবার বাসায় ওয়াসার পানির বিলতো আলাদা দিতেই হয়। এভাবে গ্রাহকের ওপর চাপ না বাড়িয়ে অন্তত খাবার পানিটা বিনামূল্যে দিতে পারে ওয়াসা।
এখন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ৩০২টি ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপন করেছে ঢাকা ওয়াসা ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ড্রিংকওয়েল। ব্যাংকের এটিএম কার্ডের মতো একটি আরএফআইডি কার্ড মেশিনে নির্দিষ্ট স্থানে রাখলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেরিয়ে আসে বিশুদ্ধ খাবার পানি। কার্ডে ১০ টাকা থেকে ৯৯৯ টাকা পর্যন্ত রিচার্জ করা যায়। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পানি সংগ্রহ করা যায়। এই সেবা পেতে পানির এটিএম বুথের গ্রাহক সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
কম খরচে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে যৌথভাবে ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাওয়ার্ড ফর করপোরেট এক্সিল্যান্স (এসিই) পুরস্কার পেয়েছিল ড্রিংকওয়েল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যান্ড বিজনেস অ্যাফেয়ার্স ২০২২ সালের পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। তখন জলবায়ুসহিষ্ণুতা বিভাগে পুরস্কার পায় ড্রিংকওয়েল।
যেভাবে ওয়াটার এটিএমের পানি বিক্রি শুরুঢাকা ওয়াসার পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করা পানি নিয়ে রাজধানীবাসীর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমন অভিযোগের মধ্যে ২০১৭ সালের মে মাসে নগরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কম দামে নিরাপদ পানি সরবরাহ করতে রাজধানীর মুগদায় প্রথম ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপন করা হয়। এ কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ড্রিংকওয়েলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় ওয়াসা। পরে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী শহরের বিভিন্ন জায়গায় তারা বুথ বসানো শুরু করে। ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত পানি পরিশোধনের মাধ্যমে বিক্রি করা হয় এসব এটিএম বুথে।
২০১৯ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় বলা হয়, ঢাকা ওয়াসা পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ। ৯১ শতাংশ গ্রাহক খাবার পানি ফুটিয়ে পান করেন। পানি ফুটিয়ে পানের উপযোগী করতে বছরে ৩২২ কোটি টাকার গ্যাস খরচ হয়।
ঢাকা ওয়াসা ও ড্রিংকওয়েলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ওয়াটার এটিএম বুথের সংখ্যা ৩০২টি। এটিএম বুথের কার্ডের গ্রাহক সংখ্যা ৭ লাখ ৮০ হাজার। প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ লিটার পানি বিক্রি হয়। ভবিষ্যতে ঢাকায় আরও ২০০ এটিএম বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিভিন্ন বুথের অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু নিম্নবিত্তই নয়, মধ্যবিত্ত এবং অনেক উচ্চবিত্তও এখন ওয়াটার এটিএম বুথের গ্রাহক। এখন আর তাদের পানি ফোটানোর কষ্ট করতে হয় না। বুথের পানি দিয়েই চলছে। যে কোনো একটি ওয়াটার এটিএম বুথে গিয়ে দায়িত্বরত অপারেটরকে বললেই কার্ড পাওয়া যায়। এজন্য সঙ্গে নিতে হবে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, দুই কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও ৫০ টাকা (ফি)। এটিএম কার্ডে একবারে সর্বোচ্চ ৯৯৯ টাকা আর সর্বনিম্ন ১০ টাকা রিচার্জ করে পানি নেওয়া যায়। কার্ড রিচার্জও করেন বুথ অপারেটর। তবে এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও রিচার্জের পদ্ধতি চালু হয়েছে।
ওয়াসা ও ড্রিংকওয়েল বলছে, যেসব এলাকায় পানির সংকট আর পানিতে গন্ধ ও দূষণ রয়েছে, সেসব এলাকায় গ্রাহক বেশি। এসব এলাকার মধ্যে মুগদা, কদমতলা, মিরপুর, ফকিরাপুল ও পুরান ঢাকায় গ্রাহক বেশি। ২০২৫ সালের মধ্যে রাজধানীতে মোট ৫০০টি এটিএম বুথ চালুর বিষয়ে ড্রিংকওয়েলের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে ওয়াসার।
এমএমএ/এএসএ