‘আমের রাজধানী’ খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে বসন্ত মানেই গাছে গাছে মুকুলের সমারোহ। চারদিকে এখন সোনালি মুকুল আর কচি পাতার মেলা। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে আমের মিষ্টি ঘ্রাণ। চাষিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন বাগানের পরিচর্যায় মুকুল রক্ষা, নিয়মিত স্প্রে, সেচ ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখায়। এর মধ্যেই জেলার কিছু ব্যতিক্রমী বাগানে দেখা মিলছে আগাম জাতের কাটিমন আমের।
মৌসুম শুরুর আগেই গাছে ঝুলছে কাঁচা-পাকা কাটিমন, যা এরইমধ্যে বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে রমজান মাসকে সামনে রেখে এই আগাম আমের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ।
জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান ৪০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে নাচোল উপজেলার ঘিওন গ্রামে গড়ে তুলেছেন কাটিমন আমের বাগান। সঠিক ছাঁটাই, সময়মতো সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমন এবং নিয়মিত তদারকির ফলে তার বাগানে এরইমধ্যে ফলন এসেছে। গাছভর্তি সবুজ ও আকারে বড় কাটিমন আম ঝুলছে থোকায় থোকায়।
হাবিবুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে প্রায় ৩০ লাখ টাকার আম বিক্রির আশা করছেন। রমজানকে ঘিরে আগাম আমের চাহিদা থাকায় বাজারদরও তুলনামূলক বেশি।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগাম বাজার ধরতে পারলে লাভ বেশি হয়। এবার ফলন ভালো, দামও ভালো পাচ্ছি। আশা করছি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারবো।’
শুধু হাবিবুর রহমান নন, জেলার আরও অনেক চাষিই কাটিমন আম চাষে ঝুঁকছেন। তাদের মতে, এই জাতের আম তুলনামূলক দ্রুত ফলন দেয়, গাছের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং রোগবালাই কম হয়। স্বাদে মিষ্টি, আঁশ কম ও দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় বাজারে এর গ্রহণযোগ্যতাও বেশি। রমজানে ইফতারে ফলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কাটিমন আমের বিক্রি আরও বেড়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিউমার্কেট ফল বাজারে গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য ফলের পাশে স্থান পেয়েছে কাটিমন জাতের আম। ইফতারের জন্য অন্য ফলের সঙ্গে কাটিমন আরও ক্রয় করছেন ভোক্তারা।
শহরের পশ্চিম পাঠানপাড়া মহল্লার বাসিন্দা ফারুক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আম হল প্রকৃতির একটি অসাধারণ উপহার। এর রসালো স্বাদ শুধু মুখেই নয়, মনকেও প্রশান্তি দান করে। গরমের দুপুর বা সন্ধ্যার পর ইফতারের সময় যখন প্রথমে ঠান্ডা আম খাওয়া হয়, তখন সেই স্বাদ যেন একেবারেই অনন্য। তাই ৩০০ টাকা দিয়ে এককেজি আম কিনলাম।’
নিউমার্কেট এলাকার ফলের দোকানি রুহুল আলী বলেন, ‘রমজানের শুরু থেকেই কাটিমন আমের চাহিদা চোখে পড়ার মতো বেড়ে গেছে। প্রতিদিনই ক্রেতারা বাজারে এসে এই রসালো আম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ইফতারের জন্য ভোক্তারা অন্যান্য ফলের সঙ্গে কাটিমন আমকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।’
শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আগে মৌসুমের শুরুর দিকে বাজারে বিদেশি আমের ওপর নির্ভরতা ছিল। কিন্তু এখন দেশেই কাটিমন উৎপাদন হওয়ায় আমদানির প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে। এতে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরাও লাভবান হচ্ছেন।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসার অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. ইয়াসীন আলী বলেন, কাটিমন আমের চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার এবং ফল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। তাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে চাষ বাড়ানো গেলে কাটিমন আম দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
এসআর/এমএস