বিনোদন

কী হবে জাহের আলভীর, ‘প্ররোচনার’ প্রমাণ কি মিলবে

অভিনয়শিল্পী জাহের আলভীর স্ত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় ফিরে তাকাতে হচ্ছে পেছনের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের শোবার ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল শিক্ষক আকতার জাহানের মরদেহ। ২০১৬ সালে আত্মহত্যা করেছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এই সহযোগী অধ্যাপক। ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলাও হয়েছিল। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় ওই মামলায় কারও সাজা হয়নি।

সম্প্রতি আফরা ইভনাত খান ইকরাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে তার স্বামী অভিনেতা জাহেদ আলভীর নামে। যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে এ মামলায় তার কী সাজা হতে পারে? ঘটনায় তার কি কোনো দায় আছে বা সেটা কি প্রমাণ করা যাবে? কী হবে এই অভিনয়শিল্পীর?

প্রয়াত আফরা ইভনাত খান ইকরা

দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০৬ ধারায় রয়েছে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মো. রোকনুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এজাহারে যেভাবে ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, তা তদন্তে প্রমাণিত হলে মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় (আত্মহত্যায় প্ররোচনা) বিচারাধীন হতে পারে। এ ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। তবে অভিযোগ প্রমাণের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করবে।’

ইকরার মৃত্যুর পরপরই একজন অভিনয়শিল্পী সহকর্মীর সঙ্গে জাহের আলভীর প্রেমের সম্পর্কের কথা সামনে এসেছে। এই সম্পর্কের জেরে ইকরা ‘আত্মহত্যা’র পথ বেছে নিয়েছেন, এমনটাই অভিযোগ ইকরার মা রেবেকা সুলতানা, পরিবারের অন্য সদস্য ও বন্ধুদের।

ইকরা ও আলভীর সংসার ভালোই চলছিল

ইকরার মৃত্যুর ঘটনায় তার স্বামী অভিনয়শিল্পী জাহের আলভী ও তার মা নাসরিন সুলতানা শিউলির নামে মামলা করা হয়েছে। গত রোববার ঢাকার পল্লবী থানায় এই মামলা করা হয়। মামলার বাদী ইকরার বাবা কবির হায়াত খান, জানিয়েছেন ইকরার বড় মামা শেখ তানভীর আহমেদ।

মামলার এজাহারে নির্যাতন ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন বাবা কবির হায়াত খান। ইকরার মৃত্যুর আগে পারিবারিকভাবে এসব সংকট সমাধানের চেষ্টা করেও কোনো ফলাফল আসেনি বলে জানান ইকরার বাবা।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে জাহের আলভীর সঙ্গে আফরা ইভনাথ খান ইকরার বিয়ে হয়। তাদের পাঁচ বছরের একটি ছেলে আছে। বিয়ের পর থেকেই জাহের আলভী তার মা নাসরিন সুলতানার প্ররোচনায় ইকরাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ইকরার পরিবার বিষয়টি জানতে পেরে পারিবারিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হয়নি। প্রায় দুই বছর আগে ইকরা জানতে পারেন, তার স্বামী অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এর পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তরা প্রায়ই ইকরাকে অপমান করতেন এবং তাদের জীবন থেকে সরে যাওয়ার জন্য চাপ দিতেন। এমনকি জাহের আলভী ইকরাকে উদ্দেশ্য করে প্রায়ই উসকানিমূলক কথা বলতেন, যা তার মানসিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ইকরার মৃত্যুর পর ফাঁস হয় স্ক্রিনশট, ইনবক্সে বন্ধুদের মধ্যে চলে নানান আলোচনা এমনকি প্রকাশ্যেও

এজাহারে লেখা হয়েছে, জাহের আলভী সামাজিকমাধ্যমেও ইকরাকে উদ্দেশ্য করে উসকানিমূলক ও অপমানজনক পোস্ট দিতেন। এমনকি ২৭ ফেব্রুয়ারি তিনি এক নারীর সঙ্গে ছবি পোস্ট করেন, যা ইকরার মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়। পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন, অপমান ও উসকানির কারণে ইকরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন।

মনোবিজ্ঞান কী বলে? প্ররোচনা দিয়ে কি কাউকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেওয়া যায়? জানতে চাইলে কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট ও সাইকো থেরাপিস্ট নুজহাত ই রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে যদি কেউ দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ, নির্যাতন, অপমান, লাঞ্ছনা বা হুমকির শিকার হন, তাহলে তিনি গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হতে পারেন। চরম হতাশা থেকে অনেক সময় কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। এই ক্ষেত্রে আইনের ধারায় ব্যাপারটি আনা সম্ভব।’

ইফফাত আরা তিথি জুটি বেঁধে অভিনয় করতেন আলভীর সঙ্গে

প্ররোচনায় যদি কেউ আত্মহত্যা করেন, তাকে কি মানসিকভাবে সুস্থ্য বলা যাবে? এই মনোরোগ চিকিৎসক বলেন, ‘সাধারণত কেউ ট্রমা বা গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হলে, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ, নির্যাতন, অপমান, লাঞ্ছনার মধ্যদিয়ে গেলে তারা মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারেন না। সেসময় বিচার-বিবেচনা বোধ সাময়িকভাবে অকার্যকর হয়ে যায়। যে কারণে তারা আত্মহত্যার মতো পদক্ষেপ নিয়ে ফেলতে পারেন। যদি বিচার-বিবেচনাবোধ কাজ করতো, তবে তিনি হয়তো বিকল্প পথ বেছে নিতেন। বিষয়টি আবার দীর্ঘদিনের নাও হতে পারে, তাৎক্ষণিক ঘটনাও হতে পারে, যেটা তিনি মেনে নিতে পারেননি। সে কারণেও আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে থাকতে পারেন।’

ঘটনার দিন (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের দিকে নাসরিন সুলতানা শিউলি ফোন করে ইকরার মামা এস এম জায়েদ আল ফাত্তাহকে জানান, মিরপুর ডিওএইচএসের বাসায় নিজের ঘরে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ইকরা। পরে তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে পল্লবী থানার পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করে এবং ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা নেয়।

ইকরার মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তার স্বজনেরা। বাবা কবির হায়াত খান বলেন, ‘আলভী ও তার মায়ের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক। আলভী আমার মেয়েকে মেরে ফেলেছে। আগে জানতাম না, মনে করতাম সে ভালো। আমার মেয়েও সংসার টেকানোর জন্য আমাদের কাছে কখনো কিছু প্রকাশ করেনি।’

ফেসবুকে আলভী ও ইকরার অভিমানপর্বের শেষ মুহূর্ত

ফেসবুকে ইকরার প্রতি সমবেদনায় কাতর ব্যক্তিদের দাবী, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার। আর কারও জীবনে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। জাগো নিউজের ফেসবুক পেজে তারেক হাসনাত তারেক মন্তব্য করেছেন, ‘দ্রুত গ্রেফতার করা হউক।’ শ্রীমৎ সবুজ আর্য লিখেছেন, ‘আজীবন বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হোক’। কেউ কেউ লিখেছেন, আলভিকে বিমানবন্দর থেকেই আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। আবার অনেকে দাবি করেছেন, আবেগের বশে তার সঙ্গে যেন অন্যায় করা না হয়।

আরও পড়ুন:দুই হাজার টাকা হাতে বিয়ে, ১৬ বছরের সংসার, পৃথিবী ছাড়লেন ইকরা‘মেয়েরা স্বামীর ভাগ কাউকে দিতে চায় না’, ইকরার সহপাঠীর চাঞ্চল্যকর পোস্ট‘রিজিকের মায়ের কাছে চলে যাব’, ভিডিওতে আত্মপক্ষ সমর্থন আলভীর

এমআই/আরএমডি