প্রথমে ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো, এরপর ইরানের আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি- মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রকে হারিয়েছে চীন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে পরিচালিত এক নাটকীয় অভিযানে মাদুরো এখন নিউইয়র্কের বন্দিশালায়, আর তেহরানের বুকে ইসরায়েলি-মার্কিন যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন খামেনি। নিজের দুই প্রধান ভূ-রাজনৈতিক অংশীদারের এমন পরিণতিতে বেইজিং ক্ষোভ প্রকাশ করলেও, কার্যত কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি তাদের।
মাদুরো ও খামেনির ওপর হামলার পর চীন একে ‘সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন’ এবং ‘শাসন পরিবর্তনের অপচেষ্টা’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের মঞ্চে কড়া কথা বলা ছাড়া তেহরান বা কারাকাসের সুরক্ষায় কোনো সামরিক বা কৌশলগত ঝুঁকি নেয়নি বেইজিং।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস’র পরিচালক ক্রেইগ সিঙ্গেলটনের মতে, ‘চীন হলো সুসময়ের বন্ধু; তারা মুখে অনেক কথা বললেও ঝুঁকি নিতে নারাজ।’
আরও পড়ুন>>ইরান যুদ্ধে কী অস্ত্র ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র, কত খরচ হচ্ছে?ইরানের অব্যাহত হামলা/ উপসাগরীয় দেশগুলো কি এবার যুদ্ধে জড়াবে?ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধে কতদিন টিকতে পারবে ইসরায়েল?
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই মুহূর্তে ‘হার্ড-নোজড প্রাগমাটিজম’ বা কঠোর বাস্তববাদী নীতি অনুসরণ করছেন। এর পেছনে প্রধান তিনটি কারণ রয়েছে:
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য স্থিতিশীলতা: চলতি মাসের শেষ দিকে বেইজিংয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের জন্য এই মুহূর্তের ‘বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি’ বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিবাচক গতি নষ্ট করতে চায় না চীন। কৌশলগত ডাইভারশন: বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ওয়াশিংটন যদি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিকভাবে বেশি জড়িয়ে পড়ে, তবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে (দক্ষিণ চীন সাগর) চীনের ওপর চাপ কমবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত থাকা চীনের জন্য এক ধরনের স্বস্তি। নিরাপত্তা গ্যারান্টার হতে অনীহা: আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘকালীন যুদ্ধের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়েছে চীন। তারা কোনো দেশের ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টার’ হয়ে নিজেকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে চায় না। অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তাচীন ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা (প্রায় ১৩ শতাংশ সমুদ্রজাত আমদানি)। তবে বেইজিং গত কয়েক বছরে তাদের তেলের উৎস বহুমুখী করেছে। বর্তমানে চীনের কাছে প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল তেলের মজুত রয়েছে, যা দিয়ে অন্তত ১১৫ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। ফলে ইরানের ওপর হামলা হলেও চীন তাৎক্ষণিক সংকটে পড়ছে না। এছাড়া সৌদি আরবের মতো অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও চীন সুসম্পর্ক বজায় রাখছে।
মিত্রদের মধ্যে সংশয়চীনের এই নিষ্ক্রিয়তা বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জা ইয়ান চং বলেন, ‘যারা চীনের সঙ্গে নিরাপত্তা ইস্যুতে কাজ করতে চায়, তারা এখন ভাবতে বাধ্য হবে যে, বিপদের সময় বেইজিং তাদের ছেড়ে চলে যাবে কি না।’
তবে বেইজিং এই সমালোচনাকে ভিন্নভাবে দেখছে। তাদের মতে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং সামরিক জোটে না জড়ানোই চীনের স্বকীয়তা। এটি বেইজিংকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুবিধা দেয় এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমায়।
ইরানে খামেনির উত্তরাধিকারী যেই হোন না কেন, অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই তাকে চীনের ওপর নির্ভর করতে হবে। অন্যদিকে, চীন এই ঘটনাগুলো ব্যবহার করে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে প্রচার করছে যে, যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘আগ্রাসী শক্তি’, আর চীন হলো ‘অহস্তক্ষেপকারী ও স্থিতিশীল’ অংশীদার।
সূত্র: সিএনএনকেএএ/