ইরানের অব্যাহত হামলা
উপসাগরীয় দেশগুলো কি এবার যুদ্ধে জড়াবে?
সপ্তাহান্তে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যখন দোহা, দুবাই ও মানামার আকাশরেখায় আঘাত হানে, তখন তা শুধু কাচ ও কংক্রিটই ভাঙেনি—ভেঙে দিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর বহুদিনের গড়ে তোলা স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিও। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা অস্থিরতার মধ্যেও নিজেদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে তুলে ধরেছিল তারা।
কিন্তু এখন এ অঞ্চলের দেশগুলো এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে—পাল্টা হামলা চালিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে একই কাতারে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নেবে, নাকি নিষ্ক্রিয় থেকে নিজেদের শহরে হামলা সহ্য করবে?
আবুধাবির নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিষয়ক অধ্যাপক মনিকা মার্কস আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এখানকার মানুষের কাছে মানামা, দোহা বা দুবাইয়ে বোমা হামলা দেখা ঠিক যেমনটা আমেরিকানদের কাছে শার্লট, সিয়াটল বা মায়ামিতে হামলা দেখার মতো অবিশ্বাস্য।’
গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন। দেশজুড়ে সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। একটি স্কুলেও আঘাত লাগে, যেখানে অন্তত ১৪৮ শিক্ষার্থী নিহত হয়।
এর জবাবে তেহরান ইসরায়েল ও উপসাগরজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত তিনজন নিহত এবং ৫৮ জন আহত হয়েছেন। দুবাইয়ের বিমানবন্দর ও কয়েকটি স্থাপনা, মানামার উঁচু ভবন, কুয়েতের বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোহাতেও ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। সৌদি আরব জানিযেছে, রাজধানী রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলেও হামলা হয়েছে। কাতারে ১৬ জন, ওমানে পাঁচজন, কুয়েতে ৩২ জন এবং বাহরাইনে চারজন আহত হয়েছেন।
যুদ্ধ ঠেকাতে চেয়েছিল তারা
উপসাগরীয় দেশগুলো এই সংঘাত চায়নি। হামলার আগে ওমান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করছিল। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি বলেছিলেন, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত না রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় শান্তি ‘হাতের নাগালে’।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালায়।
মনিকা মার্কস বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো সপ্তাহ, এমনকি মাস ধরে এই যুদ্ধের আশঙ্কা দেখছিল এবং তা ঠেকাতে বড় ধরনের কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়েছিল।
লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক রব গাইস্ট পিনফোল্ডও বলেন, এই দেশগুলো যুদ্ধ চায়নি। কিন্তু এখন তারা দ্বিধায়—ইসরায়েলের সঙ্গে একযোগে পদক্ষেপ নিলে অভ্যন্তরীণ বৈধতা ক্ষুণ্ন হতে পারে, আবার চুপ থাকলেও জনগণের চোখে দুর্বল দেখাতে পারে।
সম্ভাব্য পথ
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো হয়তো নিজস্ব কাঠামোর মাধ্যমে পদক্ষেপ নিতে পারে। ১৯৮৪ সালে গঠিত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের যৌথ বাহিনী ‘পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্স’ বা ২০১৩ সালে গঠিত একীভূত সামরিক কমান্ডের মাধ্যমে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার শঙ্কার কথা বলা হচ্ছে।
তারা সরাসরি ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করছে—এমন ধারণা এড়াতে চাইবে। বরং নিজেদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নেতৃত্বের অবস্থান দেখাতে চাইবে।
দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতি
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি লবণমুক্তকরণ স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা। এসব ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।
আরও একটি বড় আশঙ্কা তাদের ‘স্থিতিশীল বিনিয়োগ গন্তব্য’ হিসেবে সুনাম নষ্ট হওয়া। পর্যটন ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বড় আঘাত হতে পারে।
নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা
এতদিন উপসাগরীয় দেশগুলো হুথি বা হিজবুল্লাহর মতো অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীকে প্রধান হুমকি হিসেবে দেখতো। এখন সরাসরি রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধের বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পর কিছু দেশ ইরানকে তুলনামূলক কম ঝুঁকি হিসেবে দেখছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার পর সেই মূল্যায়ন বদলে যেতে পারে।
এখন উপসাগরীয় দেশগুলো দ্রুত কৌশল পুনর্বিন্যাস করছে। তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে নাকি সীমিত প্রতিরক্ষা অবস্থান নেবে, তা নির্ভর করবে ইরান পরবর্তী পদক্ষেপ কীভাবে নেয় তার ওপর। তবে আকাশরেখায় ক্ষেপণাস্ত্রের আগুন জ্বলে ওঠার পর আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/