আন্তর্জাতিক

কুর্দি বাহিনীকে অস্ত্র দিয়ে ইরানে বিদ্রোহ উসকে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

ইরানে সরকারবিরোধী বিদ্রোহ উসকে দিতে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ)। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে বুধবার (৪ মার্চ) এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানি বিরোধী দল ও ইরাকভিত্তিক কুর্দি নেতাদের সঙ্গে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য—ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যস্ত রেখে বড় শহরগুলোতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সুযোগ তৈরি করা।

সীমান্তে উত্তেজনা, আইআরজিসির হামলা

ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থানরত কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাজারও যোদ্ধা ইরান-ইরাক সীমান্তজুড়ে সক্রিয়। এসব গোষ্ঠীর কয়েকটি সাম্প্রতিক বিবৃতিতে ‘আসন্ন পদক্ষেপ’-এর ইঙ্গিত দিয়েছে এবং ইরানি বাহিনীকে পক্ষত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা কুর্দি ঘাঁটিতে ডজনখানেক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। মঙ্গলবার আইআরজিসি একাধিক কুর্দি গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করে।

আরও পড়ুন>>ইরান যুদ্ধে কী অস্ত্র ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র, কত খরচ হচ্ছে?ইরানের অব্যাহত হামলা/ উপসাগরীয় দেশগুলো কি এবার যুদ্ধে জড়াবে?মাদুরোর পর খামেনি/ মিত্রদের পতনেও ‘নীরব’ কেন চীন?

একই দিনে ইরানের কুর্দি গণতান্ত্রিক পার্টির (কেডিপিআই) সভাপতি মুস্তফা হিজরির সঙ্গে ট্রাম্পের টেলিফোনে কথা হয়েছে বলে এক জ্যেষ্ঠ কুর্দি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। আইআরজিসির হামলার লক্ষ্যবস্তু গোষ্ঠীগুলোর একটি এই কেডিপিআই।

স্থল অভিযানের শঙ্কা

সূত্রগুলো বলছে, ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে সম্ভাব্য স্থল অভিযানে ইরানি কুর্দি বাহিনী অংশ নিতে পারে। তাদের প্রত্যাশা—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সহায়তা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইরাকি কুর্দি নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন, যাতে অস্ত্র পরিবহন ও ইরাকি কুর্দিস্তানকে লঞ্চিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।

এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, কুর্দি বাহিনী ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে সামরিক সম্পদ ছড়িয়ে দিতে পারে, এমনকি উত্তর ইরানে একটি ‘বাফার জোন’ তৈরির সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।

তবে সিআইএ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা

মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যালেক্স প্লিটসাস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই ইরানে শাসন পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে চাইছে।’

তবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা জেন গাভিটো সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ইরাকের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং জবাবদিহিহীন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে শক্তিশালী করবে।

গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর বর্তমানে এমন প্রভাব বা সক্ষমতা নেই যা এককভাবে সফল বিদ্রোহ নিশ্চিত করতে পারে। উপরন্তু, কুর্দি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক বিভাজন ও পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র-কুর্দি সমন্বয়কে জটিল করে তুলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-কুর্দি সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস

কুর্দিরা রাষ্ট্রহীন একটি জাতিগোষ্ঠী; আনুমানিক ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে তিন কোটি কুর্দি তুরস্ক, ইরাক, ইরান, সিরিয়া ও আর্মেনিয়াজুড়ে বসবাস করেন। অতীতে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র কুর্দি বাহিনীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছিল।

তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন ঘটনায় কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ‘পরিত্যক্ত হওয়ার’ অনুভূতি তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সিরিয়া থেকে সেনা সরানোর সিদ্ধান্তে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস পদত্যাগ করেছিলেন, যা কুর্দি মিত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।

বর্তমানে ইরাকি কুর্দিস্তানে সিআইএ’র একটি আউটপোস্ট এবং মার্কিন কনস্যুলেট রয়েছে; সেখানেই জোটবাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত আছে।

আঞ্চলিক প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে সম্ভাব্য অস্থিরতা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ইসরায়েলি বাহিনী এরই মধ্যে ইরান-ইরাক সীমান্তবর্তী ইরানি সামরিক ও পুলিশ ঘাঁটিতে হামলা জোরদার করেছে বলে দাবি করেছে সূ্ত্রগুলো।

তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্ক করে বলেছেন, যদি বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটে, তাহলে তা কুর্দিদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র: সিএনএনকেএএ/