বাস মিস হওয়ার ভয়, মিটিংয়ে দেরি হয়ে যাওয়ার চাপ বা স্কুলে বাচ্চাকে নামিয়ে অফিসে ছুটে যাওয়া। সময়মতো জায়গায় পৌঁছে গেলেন ঠিকই, কিন্তু দেখলেন বুক ধড়ফড় করছে, শ্বাস স্বাভাবিক হচ্ছে না, মাথা গরম লাগছে বা অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছে।
অনেকে ভাবেন, এটা কি ক্লান্তি? আসলে বিষয়টি তার চেয়ে গভীর। তাড়াহুড়ো মানেই শরীরের ভেতরে শুরু হয়ে যায় এক ধরনের জৈবিক অ্যালার্ম সিস্টেম, যে অ্যালার্ম বন্ধ করার সুইচ বিষয়ে জানেন না অনেকেই।
তাড়াহুড়োয় কী ঘটে শরীরের ভেতরে?চাপের মুহূর্তে শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়। এটি আমাদের ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া চালু করে। তখন অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন রক্তে বেড়ে যায়।
আমেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক চাপের সময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, রক্তচাপ বাড়ে এবং শরীর অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থায় চলে যায়। অর্থাৎ আপনি গন্তব্যে পৌঁছে গেলেও শরীর তখনও দৌড়ের মোডে থাকে।
প্রথমত, হৃদস্পন্দনের জড়তা। দৌড়ানো বা দ্রুত হাঁটার সময় হার্ট রেট বেড়ে যায়। থেমে গেলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক মিনিট সময় লাগে।
দ্বিতীয়ত, শ্বাস-প্রশ্বাসের অস্বাভাবিকতা। তাড়াহুড়োর সময় আমরা অগভীর ও দ্রুত শ্বাস নেই। এতে শরীরে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য সাময়িকভাবে বদলে যায়, যা মাথা ঝিমঝিম বা অস্থিরতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
তৃতীয়ত, কর্টিসলের প্রভাব। স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল শরীরকে বিপদের জন্য প্রস্তুত রাখে। বিপদ কেটে গেলেও এই হরমোনের প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় না।
চতুর্থত, মস্তিষ্কের সতর্ক সংকেত। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চাপের পরে শরীর ও মনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সচেতন বিশ্রাম প্রয়োজন।
অনেক সময় দেরি হয়ে যাওয়ার অপরাধবোধ বা ‘অন্যরা কী ভাবছে’ - এই ধরনের চিন্তাও অস্থিরতাকে বাড়িয়ে দেয়। মানসিক চাপ ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া একে অপরকে প্রভাবিত করে।
দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে এটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে রূপ নিতে পারে, যা হৃদরোগ, ঘুমের সমস্যা বা উদ্বেগজনিত জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
তাড়াহুড়োর সুইচ বন্ধ্য করবেন কীভাবে?>> গন্তব্যে পৌঁছে সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু না করে দুই থেকে পাঁচ মিনিট সময় নিন।
>> ধীরে ধীরে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিন।>> বসে এক গ্লাস পানি পান করুন।>> নিজের হৃদস্পন্দন ও শ্বাসের গতি সচেতনভাবে কমানোর চেষ্টা করুন।>> সম্ভব হলে ছোট্ট একটি বিরতি নিন, চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকুন।
শরীরকে সময় দিলে সে নিজেই ভারসাম্যে ফিরতে পারে।
তাড়াহুড়ো আমাদের জীবনের অংশ, কিন্তু অস্থিরতা যেন অভ্যাসে পরিণত না হয় - সেদিকে নজর রাখা জরুরি। কারণ, পৌঁছানোই সব নয়; পৌঁছে শান্ত থাকা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন; ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ; হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল; সাইকোসোম্যাটিক মেডিসিন; ব্রেইন, বিহেভিয়ার অ্যান্ড ইমিউনিটি
এএমপি/এএসএম