নেপালের চলমান সাধারণ নির্বাচনের প্রাথমিক ভোট গণনায় চমক দেখাচ্ছেন কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ, যিনি র্যাপার থেকে রাজনীতিক হয়ে উঠেছেন। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বালেন শাহের দল প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। ফলে নেপালের জাতীয় রাজনীতিতে তার উত্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
৩৫ বছর বয়সী বালেন শাহ বর্তমানে রাজনৈতিক সংকটে তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখগুলোর মধ্যে একজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টুইটার এবং ফেসবুকে তার লাখ লাখ অনুসারী রয়েছে।
ইনস্টাগ্রামে বালেন্দ্রকে অনুসরণ করেন আট লাখেরও বেশি মানুষ। টুইটারে তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিয়মিত দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে কণ্ঠ তুলে ধরেন।
বালেনের র্যাপ গানগুলোর মধ্যেও সামাজিক বার্তা থাকে। দুই হাজার বিশ সালে প্রকাশিত তার ‘বলিদান’ গানটি দুর্নীতি, সামাজিক অবিচার এবং শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার সমালোচনা করে। গানটি ইউটিউবে এক কোটি সাতাশ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণরা গানটি শুনে বালেনকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে, যা পরবর্তী রাজনৈতিক যাত্রাকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
নেপালের হিপ-হপ অঙ্গনের সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত বালেন শাহ। দুই হাজার বারো সালে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রকাশ করেছিলেন প্রথম গান ‘সড়ক বালক’। শহরের তরুণদের সংগ্রাম ও বাস্তবতা তুলে ধরার মাধ্যমে নেপালি হিপ-হপ বা ‘নেফহপ’ কমিউনিটিতে তার যাত্রা শুরু হয়।
এরপর দুই হাজার তেরো সালে ইউটিউবে প্রকাশিত ব্যাটল র্যাপ সিরিজ ‘আর বার্জ’-এ অংশ নেওয়ার পর আন্ডারগ্রাউন্ড হিপ-হপ অঙ্গনে বালেনের পরিচিতি আরও বৃদ্ধি পায়। ধীরে ধীরে তিনি তরুণ শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার গানে প্রায়ই সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা উঠে আসে। দুর্নীতি, বৈষম্য এবং শহুরে জীবনের নানা বাস্তবতা ছিল তার গানের মূল বিষয়।
দুই হাজার পঁচিশ সালে নেপালি সিনেমা ‘লাজ শরাণম’র সাউন্ডট্র্যাক হিসেবে বালেন শাহ ‘নেপাল হাস’ শিরোনামের গান পরিবেশন করেন। গানটির কথা, সুর এবং কণ্ঠ-সবই তার। প্রথমে এটি ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়, পরে সিনেমার প্রচারের জন্য আবার প্রকাশ করা হলে দ্রুতই ইউটিউবের জনপ্রিয় সংগীত তালিকায় উঠে আসে।
দুই হাজার তেইশ সালের জুনে ভারতীয় সিনেমা ‘আদিপুরুষ’র একটি সংলাপ ঘিরে বিতর্কের জন্ম দেন বালেন শাহ। সিনেমাটিতে বলা হয়েছিল, ‘সীতা ভারতের মেয়ে’। নেপালে এই সংলাপ তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে। কারণ, রামায়ণের কাহিনি অনুযায়ী নেপালের অনেকের বিশ্বাস, সীতার জন্ম নেপালের জনকপুরে।
প্রতিবাদের স্বরূপ কাঠমান্ডুতে সব ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন বালেন। আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে পাতান হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন। শুরুতে তিনি তা মানতে অস্বীকৃতি জানান, তবে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।
আরও পড়ুন:ট্রোলিংয়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেন জাহ্নবী বিজয়-রাশমিকার বিয়ের অতিথি হলেন যেসব তারকা
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বালেন কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিচার বিভাগকে ‘ভারতের দাস’ বলেও সমালোচনা করেন। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কিছু সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখেন, যা দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে।
বালেন শাহ শুধু রাজনীতিতে নয়, শিল্প এবং সামাজিক আন্দোলনেও তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন। নির্বাচনের ফলাফলে তার জয় অথবা জনপ্রিয়তা আরও দৃঢ় করে দেবে, এবং নেপালের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের প্রভাব দেখাবে।
এমএমএফ