বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ ফিল সিমন্স বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জানিয়েছেন, পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠের সিরিজে বাংলাদেশ তিন পেসার নিয়ে খেলতে পারে। বাংলাদেশ কোচের এই মন্তব্যকে স্বাগত জানানোই উচিত। কারণ এতে বোঝা যায়, আগামী ওয়ানডে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বাংলাদেশ নিজেদের প্রস্তুতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গেই ভাবছে।
সবাই জানে, ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ আফ্রিকায়। কেপটাউন, জোহানেসবার্গ, ডারবান ও কিম্বার্লিসহ অধিকাংশ ভেন্যুর উইকেটই তুলনামূলক দ্রুতগতির। সেখানে বাউন্সও এশিয়ার অনেক উইকেটের তুলনায় বেশি। ফলে স্পিনারদের জন্য কাজটা সহজ হয় না। লাইন-লেন্থে সামান্য ঘাটতি থাকলেও বা হাতে বিশেষ বৈচিত্র্য না থাকলে সেখানে সফল হওয়া কঠিন। তাই অন্তত তিনজন পেসার দলে থাকা প্রয়োজন। সঙ্গে একজন পেস বোলিং অলরাউন্ডার থাকলে তা আরও ভালো।
বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান কোচ ফিল সিমন্স সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এবার ঘরের মাঠেই তিন পেসার খেলানোর কথা ভাবছেন। লক্ষ্য ও পরিকল্পনায় রয়েছে দূরদর্শিতা — এক কথায় সুদূরপ্রসারী চিন্তা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মাটিতে বিশেষ করে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক ভেন্যুগুলোর একটি শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। যেখানে উইকেট সাধারণত ধীরগতির ও নিচু বাউন্সের, সেখানে কি সত্যিই তিন পেসার খেলানোর মতো কন্ডিশন রয়েছে?
সম্প্রতি শেরে বাংলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বিসিএল ফাইনাল। সেই ম্যাচেও দেখা গেছে, বল অনেক সময় থেমে আসছে এবং বাউন্সও তেমন নেই। এমন নিষ্প্রাণ উইকেটে বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন পেসার নিয়ে নামার অবস্থায় আছে?
হ্যাঁ, হয়তো সম্ভব হতো। যদি র্যাঙ্কিং কিছুটা ভালো থাকত। ধরুন, বাংলাদেশ যদি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে পাঁচ বা ছয় নম্বরে থাকত, তাহলে দল ও একাদশ নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখন সেই অবস্থায় নেই। ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে টাইগাররা বর্তমানে ১০ নম্বরে। আগামী এক বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২৭ সালের মার্চের আগে যদি প্রথম আট দলের মধ্যে জায়গা করে নিতে না পারে, তাহলে বিশ্বকাপে খেলতে হলে বাংলাদেশকে বাছাইপর্ব পার হতে হবে।
তাই এখন থেকে প্রতিটি ওয়ানডে সিরিজই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সিরিজ জেতাই নয়, হোয়াইটওয়াশ করেও জেতা বড় প্লাস পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হবে। পাকিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজটিও সেই হিসাবের মধ্যেই পড়ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে — বাংলাদেশ কি তিন পেসার নিয়ে পাকিস্তানকে হারাতে পারবে? শেরেবাংলার উইকেটে কি তা সম্ভব?
পেছনে তাকালে বিষয়টি সহজ মনে হয় না। কারণ হোম অব ক্রিকেটে বাংলাদেশ সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজ খেলেছে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। সেই সিরিজে বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল। প্রথম ম্যাচে দুই পেসার নিয়ে মাঠে নামলেও শেষ দুটি ম্যাচে খেলেছে মাত্র একজন পেসার।
ওই সিরিজে স্পিনারদের ওপরই ভরসা করেছিল বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে খেলানো হয়েছিল তিন স্পিনার — মেহেদি হাসান মিরাজ, রিশাদ হোসেন ও তানভীর ইসলামকে। পরের দুই ম্যাচে তাদের সঙ্গে যোগ দেন বাঁহাতি স্পিনার নাসুম। স্পিনারদের দারুণ পারফরম্যান্সেই সিরিজ জয়ের পথ সহজ হয়।
প্রথম ম্যাচে দুই পেসার তাসকিন আহমদ ও মোস্তাফিজুর রহমান খেললেও তারা বোলিং করেছেন খুব কম। তাসকিন ২ ওভার ও মোস্তাফিজ করেন ৫ ওভার। বাকি ওভারগুলো ভাগ করে নেন স্পিনাররা।
দ্বিতীয় ম্যাচে একমাত্র পেসার হিসেবে খেলেন মোস্তাফিজ। তিনি ৮ ওভার বোলিং করেন। বাকি ৪ স্পিনার — মিরাজ, রিশাদ, তানভীর ও নাসুম প্রত্যেকে পূর্ণ ১০ ওভার বোলিং করেন।
তৃতীয় ম্যাচে মোস্তাফিজ একমাত্র পেসার হিসেবে খেললেও তাকে বোলিং করতে হয়নি। চার স্পিনারই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় স্বাগতিকরা। বাংলাদেশের করা ২৯৮ রানের জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অলআউট হয় মাত্র ১১৭ রানে। বাংলাদেশ পায় ১৭৯ রানের বিশাল জয়।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন থেকেই যায়, ফাল্গুনের শেষ দিকে প্রখর রোদের মধ্যে শেরে বাংলায় কি সত্যিই বাংলাদেশ তিন পেসার নিয়ে একাদশ সাজাবে?
শেরে বাংলার উইকেটে জিততে হলে শেষ পর্যন্ত স্পিনারদের সহায়তা লাগবে বলেই ধারণা। যদি তিন পেসার — তাসকিন, মোস্তাফিজ ও নাহিদ রানা বা শরিফুলকে খেলানো হয়, তাহলে দুই স্পিনার হিসেবে অধিনায়ক মিরাজের সঙ্গে থাকতে পারেন রিশাদ হোসেন।
তবে অতিরিক্ত স্পিনার নিতে গেলে একজন ব্যাটসম্যান কমে যেতে পারে। বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট কি মিরাজকে ধরে অন্তত সাতজন ব্যাটার ছাড়া মাঠে নামবে? যদি তা হয়, তাহলে তিন পেসার ও তিন স্পিনার মিলিয়ে একাদশ সাজানো সম্ভব।
এদিকে আরেকটি বড় হিসাব হলো — আগামী ১১ মার্চ শেরেবাংলায় পাকিস্তানের বিপক্ষে শুরু হতে যাচ্ছে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। যদি বাংলাদেশ এই সিরিজের সব ম্যাচ জিততে পারে, তাহলে র্যাঙ্কিংয়ে এক ধাপ এগোনোর সুযোগ তৈরি হবে।
এমন গুরুত্বপূর্ণ সিরিজে ‘টিপিক্যাল’ শেরেবাংলার উইকেটে বাংলাদেশ কি সত্যিই তিন পেসার নিয়ে খেলবে এবং সফল হবে, এটাই এখন দেখার বিষয়।
এআরবি/আইএন