সানজানা রহমান যুথীআমাদের সমাজে এমন অনেক মা আছেন, যারা একসময় ছিলেন কর্মজীবী নারী কিংবা পরিবারের মমতাময়ী অভিভাবক। সময়ের নির্মম পরিহাসে আজ তাদের কেউ কেউ রাস্তায় পড়ে আছেন, কেউ আবার মাজারে বা বিভিন্ন স্থানে মানুষের দয়ার উপর নির্ভর করে জীবন কাটাচ্ছেন। কোনো মায়ের হয়তো অন্যের দয়ায় একবেলা খাবার জোটে, আবার কোনো মা না খেয়েই জীর্ণ শরীর নিয়ে দিন পার করেন। এভাবেই অসহায় ও নিঃস্ব অনেক মায়ের জীবন কাটছে অনিশ্চয়তা আর কষ্টের মধ্যে।
রমজান মাসে যখন সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে ইফতারের আয়োজন শুরু হয়, তখন এই অসহায় মায়েদের মনেও জাগে একটুখানি আশার আলো। হয়তো কেউ তাদের কথা মনে করবে, হয়তো কেউ এগিয়ে এসে তাদের হাতে তুলে দেবে একবেলা ইফতার। এই সামান্য খাবারই তখন তাদের কাছে হয়ে ওঠে বড় প্রাপ্তি।
এই অসহায় মায়েদের একটু ভালো রাখার প্রয়াসে কাজ করে যাচ্ছে ‘আপন নিবাস’ নামের একটি বৃদ্ধাশ্রম। যার প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দা সেলিনা শেলী। জীবনের শুরু থেকেই সৈয়দা সেলিনা শেলী নারী অধিকার ও অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করে আসছেন।
২০১০ সালে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে এই বৃদ্ধাশ্রমের কার্যক্রম শুরু করেন। শুরুতে আশ্রমটি পরিচালিত হতো মুষ্টিচাল সংগ্রহের মাধ্যমে। মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে সামান্য চাল সংগ্রহ করেই চলত আশ্রমের খাবারের ব্যবস্থা।
সৈয়দা সেলিনা শেলী জানান, একদিন টঙ্গীতে খাবার সংগ্রহের জন্য লিফলেট বিতরণ করতে গিয়ে তিনি রাস্তায় পড়ে থাকা এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে দেখতে পান। সেই নারীকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমেই মূলত নিঃস্ব ও অসহায় মায়েদের নিয়ে কাজ করার পথচলা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে আরও অনেক অসহায় নারী এখানে আশ্রয় পেতে থাকেন।
রাজধানীর অদূরে উত্তরখান ইউনিয়ন পরিষদের মৈনারটেক এলাকায় অবস্থিত এই বৃদ্ধাশ্রমটি আজ অনেক অসহায় ও দুস্থ নারীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। বর্তমানে এখানে শুধু বৃদ্ধা মায়েরাই নন, আশ্রয় পাচ্ছে ছোট ছোট শিশুরাও। যেসব শিশুদের অনেকেরই কোনো পরিবার বা ঠিকানা নেই, তারাও এখানে নতুন করে বাঁচার সুযোগ পাচ্ছে।
বর্তমানে এই বৃদ্ধাশ্রমে প্রায় ১১০ জন আশ্রিত রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের ঠিকানা জানেন না, আবার কারো থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। জীবনের এক সময় যারা হয়তো পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন, আজ তারাই সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষ হয়ে উঠেছেন।
বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদানের মাধ্যমেই এই আশ্রমের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেই অনুদান দিয়েই এখানকার মায়েরা অন্তত একবেলা খাবার পান, মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ ঠাঁই পান।
রমজানের সময় ইফতার আয়োজন এই মায়েদের জন্য হয়ে ওঠে এক ভিন্ন আনন্দের মুহূর্ত। সামান্য কিছু খাবার আর একটু আন্তরিকতা তাদের মুখে ফুটিয়ে তোলে হাসি। তখন মনে হয়, সমাজে এখনো মানবতা বেঁচে আছে।
এই মায়েরা আমাদের সমাজেরই অংশ। তারাও নারী, একসময় যারা সমাজের পরিবর্তনে কাজ করেছেন। আজ তারা নাম- পরিচয়হীন। তাদের প্রতি একটু সহমর্মিতা দেখানো, তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার দায়িত্ব। একটু সহানুভূতি, একটু সাহায্য হয়তো তাদের জীবনে এনে দিতে পারে নতুন আশার আলো।
কেএসকে