দেশজুড়ে

বিশ্ব ঐতিহ্যের জামদানি বুনেও কষ্টে তাঁতির জীবন

ঈদকে সামনে রেখে কারিগরদের কর্মব্যস্ততায় বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জামদানি পল্লি। উপজেলার বিসিক জামদানি পল্লিসহ বিভিন্ন এলাকার জামদানি কারিগর ও শিল্পীরা শাড়ি তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। যেন দম ফেলার ফুরসত নেই তাঁতিদের। কেউ কাপড়ে সুতা তুলছেন, কেউ সুতা রঙ করছেন, কেউ শাড়ি বুনছেন, আবার কেউবা শাড়িতে নকশার কাজ করছেন।

তবে যে শিল্পের সৌন্দর্যে বিশ্ব মুগ্ধ, সেই শিল্পের কারিগরদের জীবন অনেক ক্ষেত্রেই কষ্টে ভরা। সুতার দাম বৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে অনেকেই পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘ পরিশ্রমের পরও লাভ সীমিত—এটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁতিদের কাছে। কয়েক বছর আগে এখানে প্রায় ৫ হাজার তাঁতি ছিলেন, বর্তমানে সাড়ে ৩ হাজারের মতো তাঁতি এ কর্মকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।

রূপগঞ্জের অনেক তাঁতি জানান, একটি শাড়ি তৈরি করতে মাসের পর মাস শ্রম দিলেও তারা ন্যায্য মূল্য পান না। পাইকারি বাজারে অনেক সময় কম দামে শাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হন।

সকালবেলার সোনালী আলো জানালার ফাঁক দিয়ে পড়ছে তাঁতঘরের মেঝেতে। কাঠের তাঁতের মৃদু শব্দে ধীরে ধীরে বোনা হচ্ছে এক টুকরো ইতিহাস। সূক্ষ্ম সুতোয় শিল্পীর নিপুণ হাতে ফুটে উঠছে ফুল, লতা আর জ্যামিতিক নকশা। প্রতিটি নকশা যেন একেকটি স্বপ্ন, একেকটি গল্প। এই গল্পই বাংলার শত বছরের ঐতিহ্য। এটি শুধু একটি শাড়ি নয়, জামদানি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গর্বিত প্রতীক। আর সেই ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র আসন্ন ঈদকে ঘিরে বিশাল কর্মযজ্ঞে হয়ে উঠেছে বেশ জমজমাট।

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা এই দুই ঈদকে কেন্দ্র করে রূপগঞ্জের তাঁতপল্লিতে বাড়ে কর্মচাঞ্চল্য। ব্যবসায়ীরা জানান, সারা বছরের মোট বিক্রির প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হয় ঈদ মৌসুমে। চলতি ঈদকে সামনে রেখে অনেক ব্যবসায়ী ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বিক্রি বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এ বছর ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে হালকা ও সফট কালারের জামদানির দিকে। বিশেষ করে অফ-হোয়াইট, প্যাস্টেল শেড, আকাশি, পিঙ্ক ও মিন্ট গ্রিন রঙের চাহিদা বেশি।

জামদানিই হচ্ছে বাংলার হারিয়ে যাওয়া মসলিনের বিকল্প প্রতিরূপ। অতীতের মসলিনের মতোই, আজকের জামদানি শাড়ির শিল্প-সৌন্দর্যের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। কেবল দেশের বাজারেই নয়, বিশ্ববাজারেও জামদানির ব্যাপক চাহিদা গড়ে উঠেছে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে এসব জামদানি শাড়ি রফতানি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেই মোগল দরবার থেকে আজকের বিশ্বমঞ্চে তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এ শিল্প। জামদানির ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরোনো। গবেষকদের মতে, প্রাচীন বাংলার সূক্ষ্ম মসলিন কাপড়ের ধারাবাহিকতা থেকেই জন্ম নিয়েছে জামদানি শিল্প। মোগল আমলে এই শিল্প বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা পায়। তখনকার ঢাকার জামদানি ছিল রাজদরবারের অন্যতম বিলাসবহুল পোশাক। সম্রাটদের রানী, রাজকন্যা ও অভিজাত নারীরা জামদানি পরতেন রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক হিসেবে।

জামদানি শব্দটির ফারসি ভাষা থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। ‘জাম’ অর্থ ফুল এবং ‘দানি’ অর্থ ধারক। অর্থাৎ ফুল ধারণকারী কাপড়। এই শাড়ির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাসমান নকশা। সূক্ষ্ম সুতো দিয়ে কাপড়ের গায়ে এমনভাবে নকশা তৈরি করা হয়, যেন তা কাপড়ের ওপর ভেসে আছে।

এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ১৯৯১ সালে উপজেলার তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) প্রায় ২০ একর জমির ওপর প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলে জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণা কেন্দ্র। লক্ষ্য ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তাঁতিদের অবকাঠামোগত সুবিধাসহ একত্র করা এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টেকসই করা। বর্তমানে শিল্পনগরীতে মোট ৪১৬টি প্লট রয়েছে, এরমধ্যে ৪০৭টি জামদানির জন্য বরাদ্দ। যেখানে শত শত জামদানি শিল্পীদের নিখুঁত হাতে নিপুণভাবে তৈরি হচ্ছে এসব জামদানি শাড়ি।

অন্যদিকে উপজেলার তারাবো, গোলাকান্দাইল, ভুলতা, গাউছিয়া, কাঞ্চন ও আশপাশের এলাকায় এবং পার্শ্ববর্তী উপজেলা সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য তাঁতঘরে প্রতিদিন বোনা হচ্ছে নতুন নতুন জামদানি। তবে ঐতিহ্যের এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো তাঁতির সংগ্রামের গল্প দীর্ঘ শ্রম, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন।

ঐতিহ্যগতভাবে জামদানি সম্পূর্ণ হাতে বোনা হয়। একটি শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগে ৭ থেকে ১৫ দিন। তবে জটিল নকশার শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগে কয়েক মাস। এমনকি ভালো মানের একটি শাড়ি তৈরি করতে ৬ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তবে এসব নকশা ও কারুকাজের জটিলতার ওপর নির্ভর করে। প্রতিটি নকশার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কারিগরি অভিজ্ঞতা।

একটি তাঁতে সাধারণত দুইজন তাঁতি কাজ করেন। একজন সুতো পরিচালনা করেন এবং অন্যজন নকশা বুনে দেন। সূক্ষ্ম সুতো দিয়ে তৈরি নকশা কাপড়ের গায়ে ভাসমান থাকে যা জামদানির প্রধান বৈশিষ্ট্য। ঐতিহ্যবাহী এই জামদানিতে দেখা যায় নানা ধরনের নকশা—কলকা, ফুল, জাল, তেরচা, পানা, হাজার বুটি, জলপাই ইত্যাদি।

তাঁতিরা জানান, ৫ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা মূল্যের জামদানি তৈরি করেন তারা। বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতায় টিকতে গিয়ে জামদানির শিল্পীরা তাদের তাঁতে সংযোজন করেছেন আরও কিছু প্রয়োজনীয় পোশাক পরিচ্ছদ। এখন শুধু শাড়িই নয়, জামদানি দিয়ে তৈরি হচ্ছে থ্রি-পিস, ওড়না, পাঞ্জাবির কাপড়, স্কার্ফসহ বিভিন্ন ফ্যাশন পোশাক। ফলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গেও তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। উপজেলার হাজারো তাঁতি তাদের নিপুন শিল্প কর্মের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য ধরে রাখছেন।

তবে জামদানি শিল্পীদের লাভের গুড় এখন পিঁপড়ায় খাচ্ছে। অধিকাংশ তাঁতিই মহাজনদের কাছে দেনার দায়ে বাধা। মহাজনদের দাদন গুণছেন, পাচ্ছেন শুধু মজুরি। সরাসরি তারা শাড়ি বাজারে নামাতে পারছেন না। তাঁতিরা মহাজনদের কাছ থেকে সুতা নিয়ে যান, তাদের দেওয়া নকশা অনুযায়ী শাড়ি তৈরি করে আনেন। শাড়ি প্রতি মজুরি হিসেবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে হাড়ভাঙা খাটুনির পর মজুরি পান কম। ফলে শিল্পীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন জামদানি তৈরিতে।

তবে এতকিছুর পরও জামদানি শিল্পের প্রসারে নতুন সম্ভাবনার দিগন্তও খুলছে। অনলাইন মার্কেটপ্লেসে ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এখন অনেক উদ্যোক্তা সরাসরি তাঁতিদের কাছ থেকে জামদানি সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কিছুটা কমছে এবং তাঁতিরা তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন।

অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে জামদানিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এর ফলে বিদেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছেও জামদানির চাহিদা বাড়ছে। অনলাইন অর্ডারের সংখ্যাও আগের তুলনায় বেড়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

জামদানি পল্লির কারিগর আব্দুল মজিদ বলেন, এই শিল্প বিশ্বস্বীকৃত হলেও কারিগররা ভালো নেই। আমাদের পরিশ্রমের কাজের সুবিধা নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী, মহাজন ও ফড়িয়ারা। তাঁতিদের সমস্যাগুলো দূর করে সরকার সহযোগিতা করলে জামদানি শিল্প বেঁচে থাকবে।

তাঁত মালিক আজগর আলী বলেন, বর্তমানে কারিগরের অভাব দেখা দিয়েছে। ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দাদন দিয়েও কারিগর পাওয়া যাচ্ছে না। আবার পুঁজির অভাবে তারা নিজেরাও তাঁত করতে পারছেন না।

জামদানি কারিগর রোমান মিয়া, আবু সালেহ ও জাকির হোসেন বলেন, একটি শাড়ি তৈরিতে এক সপ্তাহ থেকে দুই তিন মাস, এমনকি একটি উন্নত মানের শাড়ি তৈরিতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। একটি শাড়ি তৈরিতে সুতাসহ কাঁচামালের খরচ বাদে লভ্যাংশের অর্ধেক তাঁতিরা পায় বাকিটা মহাজন নেয়। তাঁতিদের পুঁজি থাকলে তারা নিজেরাই তাঁত বসাতে পারতো। এতে প্রকৃত তাঁতিরা লাভবান হত এবং জামদানি শিল্প প্রসারে ভূমিকা রাখত।

সুমাইয়া জামদানি হাউজের স্বত্বাধিকারী নারী উদ্যোক্তা সুমাইয়া আক্তার বলেন, আমাদের এখানে চার হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক দেড় লাখ টাকা দামের শাড়িও পাওয়া যায়। স্বল্প মূল্য থেকে মাঝারি মূল্যের শাড়ি সব সময় আমাদের স্টকে থাকে। কেউ উচ্চ মূল্যের শাড়ি নিতে চাইলে আমরা অর্ডার নিয়ে সেটা প্রস্তুত করে দিই। শোরুম ও অনলাইন প্লাটফর্ম থেকে আমরা সারা বছর জামদানি শাড়ি বিক্রি করে থাকি। তবে আসন্ন ঈদ উপলক্ষে বেচা-বিক্রি ভালোই হচ্ছে। অনলাইন অর্ডারের সংখ্যাও আগের তুলনায় বেড়েছে।

বিসিক জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের বিসিক শিল্পনগরীতে সারা বছরই জামদানি পণ্য কেনাবেচা হয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে বিশেষ করে ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে মূলত কেনাবেচা অনেক বেড়ে যায়। জামদানি বিক্রির জন্য বিসিক এ সপ্তাহে একদিন হাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে তাদের প্লটে শোরুমসহ প্রত্যেকটা উদ্যোক্তার নিজস্ব অনলাইন মাধ্যম রয়েছে। এসব ফেসবুক পেজ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তারা জামদানি বিক্রি করছে। আমরা তাঁতিদের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও নকশা উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে আসছি। আধুনিক বাজারের চাহিদা মাথায় রেখে পণ্যের বৈচিত্র্য, মানোন্নয়ন ও বিপণন সম্প্রসারণে আমরা কাজ করছি।

এফএ/এএসএম