খেলাধুলা

বল রেখে মাঠেই ভয়াবহ সংঘর্ষ, ২৩জনকে লাল কার্ড (ভিডিও)

ব্রাজিলের মিনেইরো অঙ্গরাজ্যের শীর্ষ ফুটবল প্রতিযোগিতা ‘মিনেইরো চ্যাম্পিয়নশিপে’র ফাইনালে ঘটে গেল নজিরবিহীন ঘটনা। ক্রুজেইরো ও অ্যাতলেতিকো মিনেইরোর মধ্যকার ম্যাচের শেষ মুহূর্তে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে, ম্যাচ শেষে রেফারি মোট ২৩ জন খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেন।

বেলো হরাইজন্তের মিনেইরাও মাঠে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে ৬০ মিনিটে কাইও জর্জের করা গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল ক্রুজেইরো। ম্যাচ শেষের আগমুহূর্তে বল নিয়ে ক্রুজেইরোর মাঝমাঠের খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ান ও অ্যাতলেতিকো মিনেইরোর গোলরক্ষক এভারসনের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। যা, মুহূর্তেই সংঘর্ষে রূপ নেয়।

অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সংঘর্ষ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। মাঠজুড়ে দুই দলের খেলোয়াড়রা একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিল, ঘুষি, লাথি ও ধাক্কাধাক্কিতে পুরো মাঠ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গোলবারের সামনে শুরু হওয়া মারামারি, ধীরে ধীরে মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে সেটা। মনে হচ্ছিল, ফুটবল নয়, যেন কোনো মারামারি বা কুস্তি টাইপের খেলা হচ্ছিল। পরিস্থিতি শান্ত করতে বেশ সময় লেগে যায়।

ম্যাচ শেষে রেফারি মাতেউস কানদাসান তার প্রতিবেদনে জানান, এই সংঘর্ষে অংশ নেওয়ার কারণে মোট ২৩ জন খেলোয়াড়কে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২১ জনকে প্রতিপক্ষকে ঘুষি ও লাথি মারার অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে সংঘর্ষের তীব্রতার কারণে তখনই লাল কার্ড দেখানো সম্ভব হয়নি।

অন্য দুই খেলোয়াড়- ক্রিশ্চিয়ান ও গোলরক্ষক এভারসন- সংঘর্ষের মূল ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিশ্চিয়ান অতিরিক্ত শক্তি দিয়ে এভারসনের মাথায় আঘাত করেন এবং এভারসন হাঁটু দিয়ে প্রতিপক্ষের মুখে বেশ কয়েকবার আঘাত করেন।

এ ম্যাচে দেখানো ২৩টি লাল কার্ড ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এর আগে ১৯৫৪ সালে রিও-সাও পাওলো প্রতিযোগিতায় পর্তুগেসা ও বোটাফোগোর ম্যাচে ২২ জন খেলোয়াড় বহিষ্কার হয়েছিল। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে।

এই মারামারির ঘটনায় পরিচিত তারকা ফুটবলাররাও জড়িয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে ছিলেন রেনান লোদী ও হাল্ক।

মোট ২১ জন খেলোয়াড়কে এই সংঘর্ষে অংশ নেওয়ার কারণে বহিষ্কার করা হয়। ক্রুজেইরো দলের যেসব খেলোয়াড় বহিষ্কৃত হন তারা হলেন- ক্যাসিও, ফাগনার, ফাব্রিসিও ব্রুনো, জোয়াও মার্সেলো, ভিয়ালবা, কাউয়া প্রাতেস, লুকাস রোমেরো, মাতেউস হেনরিক, ওয়ালাসে, জেরসন ও কাইও জর্জে।

আর অ্যাতলেতিকো মিনেইরো দলের বহিষ্কৃত খেলোয়াড়রা হলেন- গ্যাব্রিয়েল ডেলফিম, প্রেসিয়াদো, লিয়ানকো, রুয়ান ত্রেসোলদি, জুনিয়র আলোনসো, রেনান লোদী, আলান ফ্রাঙ্কো, আলান মিনদা, কাসিয়েরা এবং হাল্ক।

রেফারি মাতেউস দেলগাদো কানদানসান তার প্রতিবেদনে বহিষ্কারের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, ‘ম্যাচ শেষ হওয়ার পর শুরু হওয়া ব্যাপক সংঘর্ষে প্রতিপক্ষকে ঘুষি ও লাথি মারার কারণে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এতটাই বিশৃঙ্খল ছিল যে তখনই লাল কার্ড দেখানো সম্ভব হয়নি।’

রেফারি তার ম্যাচ প্রতিবেদনে গোলরক্ষক এভারসনের ঘটনাটি সম্পর্কে উল্লেখ করেন এভাবে, ‘ফাউলের শিকার হওয়ার পর তিনি প্রতিপক্ষকে মাটিতে ফেলে দেন, তার দিকে ছুটে যান এবং প্রতিপক্ষের ৮৮ নম্বর খেলোয়াড়ের মুখে হাঁটু দিয়ে আঘাত করেন। এরপরই মাঠে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়, যার কারণে তখন লাল কার্ড দেখানো সম্ভব হয়নি।’

ক্রিশ্চিয়ানের ঘটনায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বল তখন গোলরক্ষকের দখলে থাকা অবস্থায় তিনি প্রতিপক্ষের ২২ নম্বর খেলোয়াড়ের মাথায় শিন দিয়ে আঘাত করেন। আঘাতটি ছিল অতিরিক্ত শক্তি ও তীব্রতার সঙ্গে করা। এরপরই সাধারণ মারামারি শুরু হয়, ফলে তখন বহিষ্কারাদেশ দেখানো সম্ভব হয়নি।’

রেফারি আরও উল্লেখ করেন, ‘ম্যাচ শেষ হওয়ার পর শুরু হওয়া মারামারিতে প্রতিপক্ষকে ঘুষি ও লাথি মারার কারণে সংশ্লিষ্টদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে তখনই লাল কার্ড দেখানো সম্ভব হয়নি।’

বহিষ্কৃত সব খেলোয়াড়কে আগামী বছরের মিনেইরো প্রতিযোগিতায় তাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে।

ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ হাল্কের

ম্যাচ শেষে হাল্ক সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক। কোনো ফুটবল ম্যাচে এমন সহিংসতা আমি আগে কখনো দেখিনি। আমরা এমন উদাহরণ স্থাপন করতে পারি না, কারণ এর প্রভাব সারা বিশ্বে পড়ে। আমাদের নিজেদের ভাবমূর্তি এবং ক্লাবের সম্মান রক্ষা করার দায়িত্ব রয়েছে।’

অন্যদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শিরোপা জিতে আনন্দ প্রকাশ করেছেন ব্রাজিল জাতীয় দলের সাবেক কোচ তিতে। তিনি বলেন, ‘ক্রুজেইরোর সমর্থকদের প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আছে। কখনো কখনো হয়তো আমি ভুল করতে পারি, কিন্তু সমর্থকদের প্রতি সম্মান, কাজের প্রতি সততা এবং মর্যাদাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

এই ঘটনার পর দুই ক্লাবের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ তারা নিজেদের খেলোয়াড় ও দলের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে।

আইএইচএস/