তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার জীবনীভিত্তিক গ্রন্থ ‘মহাজীবনের উপাখ্যান’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। লেখক ও সাংবাদিক সাবরিনা শুভ্রা বইটি রচনা করেছেন।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান সেলিম, গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম বাবর, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন এবং দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক শায়রুল কবির। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দশমিক প্রকাশনীর প্রকাশক দীপান্ত রায়হান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শামা ওবায়েদ বলেন, ১৭ বছর পর বাংলাদেশ আবার গণতন্ত্রের পথে হাঁটা শুরু করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া গত ১৭ বছর নীরবে দেশের জন্য ও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। প্রতিহিংসামূলক মামলায় তাকে ছয় বছর কারাভোগ করতে হয়েছে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও সুচিকিৎসার জন্য তাকে দেশের বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদের পতনের পর ভিডিও বার্তায় খালেদা জিয়া দেশবাসী ও বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে যে বক্তব্য দেন, সেখানে তিনি প্রতিহিংসার কোনো ভাষা ব্যবহার করেননি। বরং তিনি সবাইকে প্রতিহিংসা পরিহার করে ভালোবাসা ও ঐক্যের বার্তা দেওয়ার আহ্বান জানান এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দল, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা বলেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, বইটিতে লেখিকা খালেদা জিয়ার জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন। একজন সিঙ্গেল মাদার ও সিঙ্গেল প্যারেন্ট হিসেবে সংসার সামলানো থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ হিসেবে তার সংগ্রামের কথা এতে এসেছে। তবে শুধু বই পড়লেই হবে না, তার কর্মজীবন, রাজনৈতিক জীবন এবং দেশের প্রতি তার ভালোবাসা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ ও শিক্ষার্থী। এই নতুন প্রজন্মের সামনে খালেদা জিয়ার জীবন ও আদর্শ তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কেমন মানুষ ছিলেন, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে কীভাবে কাজ করেছেন এবং দেশ ও দলের জন্য তার কী ত্যাগ-এসব বিষয় নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সময়কাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া দেশের মানুষের জন্য কাজ করেছেন। যখনই গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তিনি আন্দোলনের মাধ্যমে তা রক্ষার চেষ্টা করেছেন। আজ যদি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হতেন। কারণ নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত নারীদের শিক্ষা অবৈতনিক করা-তার ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নারীর ক্ষমতায়নে নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, দেশের নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধনের মাধ্যমে নারীরা পারিবারিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও সক্ষম হবেন এবং সমাজে এগিয়ে যাবেন।
বিএনপির এই নেত্রী বলেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক নেতা-নেত্রী এলেও বেগম খালেদা জিয়া এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যাকে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই শ্রদ্ধা ও সম্মান করতেন। এমনকি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও তাকে সম্মান করতে বাধ্য হয়েছেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের বিপুল উপস্থিতিই প্রমাণ করে তারা কতটা জনপ্রিয় ছিলেন।
গণতন্ত্র রক্ষা করা কঠিন উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার এবং গণতন্ত্রকে নষ্ট করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র চলছে। গত ১৭ বছরে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী গুম, খুন ও মামলার শিকার হয়েছেন। তাদের ত্যাগের কারণেই আজ দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। কোটা আন্দোলন এবং বিভিন্ন গণআন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদেরও স্মরণ করতে হবে। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ গণতন্ত্রের মুখ দেখা যাচ্ছে।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বেগম খালেদা জিয়া পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। প্রতিবেশী দেশ, ইউরোপ-আমেরিকা ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তিনি মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতিই খালেদা জিয়া অনুসরণ করেছিলেন এবং বর্তমানে সেই নীতিই অনুসরণ করা হচ্ছে-যার মূল কথা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস লিখতে গেলে যেমন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছাড়া সেই ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকবে, সে ইতিহাস হবে না; সেরকম আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস লিখতে গেলে আমাদের দেশনেত্রী, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কর্মকাণ্ড লিখতে হবে। তা নাহলে সে ইতিহাস সম্পূর্ণ না।
তিনি বলেন, যতবার আমাদের দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আমার জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে, ততবার যে আপসহীনতার নিদর্শন তিনি দেখিয়েছেন, যে অসামান্য ভূমিকা দেখিয়েছেন; তা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
এফএআর/এমএমএআর