দীর্ঘ ২০ বছর পর ইতালিতে এবারের পবিত্র রমজান মাস ফিরে এসেছে শীতল আবহাওয়া আর বসন্তের পরশ নিয়ে। গত প্রায় দুই দশক ধরে প্রখর গ্রীষ্মে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা রোজা রাখার পর, এবার ২০ বছরের রেকর্ড ভেঙে রোজা এসেছে ফেব্রুয়ারি-মার্চে। ফলে দিনের দৈর্ঘ্য কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৩ ঘণ্টায়, যা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নিয়ে এসেছে অভাবনীয় প্রশান্তি।
ইতালিতে এ বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রোজা শুরু হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় কোনো চাঁদ দেখা কমিটি না থাকায় ‘ইতালীয় ইসলামিক কালচারাল সেন্টার’ ও ‘হিলাল কমিটি’র মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। এর প্রভাবে প্রথম রাতে কিছু মসজিদে তারাবিহ না হলেও পরদিন থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে অধিকাংশ প্রবাসী সিয়াম সাধনা শুরু করেন।
প্রবাসের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশইতালিতে বর্তমানে দুই লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন। বিশেষ করে রাজধানী রোমে বাংলাদেশিদের আধিক্য এতটাই বেশি যে, রমজানের কেনাকাটা আর ইফতারের প্রস্তুতি দেখে মনে হয় এ যেন প্রবাসের বুকে এক ‘অঘোষিত বাংলাদেশ’। দেশি গ্রোসারি ও সুপারশপগুলোতে পেঁয়াজু, আলুর চপ আর বেগুনির সুবাস প্রবাসীদের মনে করিয়ে দেয় নাড়ির টান।
কর্মব্যস্ততা ও ইফতারের সংগ্রামইতালির ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনে রোজা রাখা প্রবাসীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যারা রেস্টুরেন্ট বা ডাবল শিফটে কাজ করেন, তাদের জন্য ইফতারের সময় মেলানো বেশ কঠিন। অনেক শ্রমজীবী প্রবাসী সেহরি খেয়ে কাজে বের হন এবং কাজ শেষে ফেরার পথেই ইফতারের সময় হয়ে যায়। তবে কষ্টের মাঝেও তৃপ্তি খুঁজে পান তারা যখন বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের সঙ্গে মসজিদে বসে ইফতার করেন। রোমের মসজিদগুলোতে প্রতিদিন ৪শ থেকে ৫শ মানুষের ইফতারের আয়োজন করা হয়।
এ বছর রোমে ‘ইল ধূমকেতু অ্যাসোসিয়েশন’ খোলা মাঠে এক বিশাল ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। এই আয়োজনের বিশেষত্ব ছিল এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। আয়োজক নুরে আলম সিদ্দিকী বাচ্চু জানান, এই ইফতারে মুসলিমদের পাশাপাশি স্থানীয় গির্জার ফাদার, মন্দিরের পুরোহিত এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। এটি ইতালীয় প্রশাসনের কাছে বাংলাদেশি কমিউনিটির সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরেছে।
ইতালীয়দের চোখে ইসলামলেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, স্থানীয় ইতালীয়দের মাঝেও ইসলামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৌতূহল বাড়ছে। তারা আগে থেকেই খোঁজ নেন রোজা কবে শুরু হচ্ছে। এই সম্প্রীতি প্রবাসীদের মনে বিশেষ গর্বের জন্ম দেয়।
রহমত ও মাগফেরাতের দিনগুলো পেরিয়ে রোজা এখন নাজাতের পথে। ইতালিতে প্রবাসীদের মাঝে এখন কেবল প্রতীক্ষা আকাশজুড়ে ঈদের বাঁকা চাঁদের, যা সব ক্লান্তি ভুলিয়ে বয়ে আনবে অনাবিল আনন্দ।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইউরোপ বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব।
এমআরএম/এএসএম