যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং রপ্তানি কার্যক্রমে নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।
বুধবার (১১ মার্চ) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানিয়েছে ডিসিসিআই।
ডিসিসিআই জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের ফলে ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।
মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস। সেখানে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতোমধ্যে প্রতি ব্যারেল ১০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে।
ডিসিসিআই মনে করে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থানে থাকলে বাংলাদেশের বহিঃখাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও সম্প্রসারিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এছাড়া বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করছে। বিশ্বে মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ফ্রেইট চার্জ, বীমা প্রিমিয়াম এবং পণ্য সরবরাহের সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত, এই পরিস্থিতিতে বাড়তি লজিস্টিক ব্যয়, সাপ্লাই চেইন বিঘ্ন এবং সমুদ্রপথে পরিবহনের বাড়তি ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।
ডিসিসিআই আরও উল্লেখ করেছে যে, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত সাত মাস ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়লে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
তবে বৈশ্বিক এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সম্প্রতি এলএনজি, এলপিজি, ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি বহনকারী ১০টিরও বেশি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করেছে, যা স্বল্পমেয়াদে কিছুটা আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং দেশের তাৎক্ষণিক জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
তবুও ডিসিসিআই মনে করে, সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী বা ভৌগোলিকভাবে আরও বিস্তৃত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতিকে সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে ডিসিসিআই সরকারের প্রতি প্রয়োজনীয় অগ্রিম ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশেষ করে কৌশলগত জ্বালানি মজুদ শক্তিশালী করা, জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, সাপ্লাই চেইনের কার্যকারিতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে ডিসিসিআই। কারণ দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংঘাত শুধু বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আইএইচও/এমএমএআর