বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি এক অস্থির সময় পার করছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ‘তেল সংকট’ এখন কেবল কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা—সবই বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই সংকট কেবল তেলের দাম বৃদ্ধি নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এক বিশাল চাপ।
দুই.বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য (১১ মার্চ ২০২৬) অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুসারে দেশের প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ২৯.৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদিও এই পরিমাণটি একটি স্থিতিশীল অবস্থানের আভাস দেয়, তবে আমদানিকৃত জ্বালানির মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে প্রতি মাসে যে পরিমাণ ডলার ব্যয় হচ্ছে, তা রিজার্ভের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। এই চাপ সামলাতে না পারলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা দুরূহ হয়ে পড়বে।
তিন.জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সকল বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জন্য অত্যন্ত কঠোর ও বাস্তবমুখী কিছু নির্দেশনা জারি করেছে। কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বা গণপরিবহন ব্যবহার করার যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তা কেবল জ্বালানি সাশ্রয়ই করবে না, বরং সমাজের নীতিনির্ধারণী স্তরে কৃচ্ছ্রসাধনের একটি বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। এছাড়া এসি ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট সীমা (২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস), অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার এবং সশরীরে উপস্থিতির বদলে অনলাইন সভার ওপর জোর দেওয়ার পদক্ষেপগুলো আমদানিনির্ভর তেলের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা কমাতে সহায়ক হবে।
চার.জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে মানবিক ও করুণ প্রভাব পড়ছে রাইড শেয়ারিং খাতের ওপর। হাজার হাজার মানুষ আজ পাঠাও বা উবার চালিয়ে তাদের সংসার চালান। কিন্তু তেলের সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে তাদের আয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে জ্বালানি কিনতে। সামনেই পবিত্র ঈদুল ফিতর। এই উৎসবের আগে যদি চালকদের পর্যাপ্ত রোজগার না হয়, তবে তাদের পরিবার নিয়ে পথে বসার উপক্রম হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাইড শেয়ারিং কেবল যাতায়াত ব্যবস্থা নয়, এটি লাখো মানুষের কর্মসংস্থান।
জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে মানবিক ও করুণ প্রভাব পড়ছে রাইড শেয়ারিং খাতের ওপর। হাজার হাজার মানুষ আজ পাঠাও বা উবার চালিয়ে তাদের সংসার চালান। কিন্তু তেলের সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে তাদের আয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে জ্বালানি কিনতে। সামনেই পবিত্র ঈদুল ফিতর। এই উৎসবের আগে যদি চালকদের পর্যাপ্ত রোজগার না হয়, তবে তাদের পরিবার নিয়ে পথে বসার উপক্রম হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাইড শেয়ারিং কেবল যাতায়াত ব্যবস্থা নয়, এটি লাখো মানুষের কর্মসংস্থান। এই ক্ষুদ্র যোদ্ধাদের সুরক্ষায় বিশেষ তেল সংগ্রহ নীতিমালা প্রয়োজন।
এই ক্ষুদ্র যোদ্ধাদের সুরক্ষায় বিশেষ তেল সংগ্রহ নীতিমালা প্রয়োজন। নিবন্ধিত চালকদের জন্য পাম্পগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিক রেশনিং পদ্ধতি বা ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে তেল কিনলে সরাসরি ভর্তুকি (ক্যাশব্যাক) দেওয়া যেতে পারে। ঈদের আগের এই সময়ে তাদের জন্য জ্বালানি প্রাপ্যতা সহজ করা না গেলে এটি একটি বড় সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
পাঁচ.একইভাবে, আমাদের কৃষি ও শিল্প খাতকেও সুরক্ষা দিতে হবে। কৃষি সেচ কাজের জন্য ডিজেল-চালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীলতা এবং শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে বিশ্ববাজারে আমাদের রপ্তানি সক্ষমতা কমবে এবং খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তাই বিলাসী খাতে জ্বালানি সাশ্রয় করে সেই উদ্বৃত্ত শক্তি কৃষি, শিল্প ও ক্ষুদ্র সেবা খাতের চাকা সচল রাখতে ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি।
ছয়.তেল সংকট মোকাবিলা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামগ্রিক জাতীয় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য দেওয়া সাশ্রয়ী নির্দেশনা যেন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে, তার কঠোর তদারকি প্রয়োজন। পাশাপাশি রাইড শেয়ারিং চালকদের মতো নিম্ন-আয়ের মানুষদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের ছোট ছোট সাশ্রয়ী পদক্ষেপই আগামী দিনের বড় কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। রিজার্ভ রক্ষা এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে কৃচ্ছ্রসাধন আর বিলাসিতা নয়, বরং এখন আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার আবশ্যকতা।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com
এইচআর/এমএস