ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তোলা শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করা হয়েছে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত সাতজনের নাম। এদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ছয়জন এবং বিএনপির একজন।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) অধিবেশনের প্রথম দিন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সংক্ষিপ্ত বিরতি শেষে রেওয়াজ অনুযায়ী শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
এসময় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা, সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, সাবেক শুরা সদস্য মীর কাসেম আলী, সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করার প্রস্তাব ওঠে।
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানান। তিনি বিএনপির সাবেক এমপি ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নামও যুক্ত করে নেন। সংসদে আলোচনা শেষে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়।
২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। ওই সংসদে এমপি ছিলেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে ওই সাতজনই একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। তাদের মধ্যে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত সাঈদী কারাগারে মারা যান। এছাড়া ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাকি ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
শোকপ্রস্তাব উত্থাপনের পর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম আরও কয়েকটি নাম যুক্ত করার অনুরোধ জানান। তার প্রস্তাবে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ছাড়াও ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য মশিউর রহমানের নাম যুক্ত করার কথা বলা হয়। পরে স্পিকার তা অনুমোদন করেন।
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য দিতে উঠে বলেন, শোকপ্রস্তাবে কিছু নাম বাদ পড়েছে। সেগুলো বলার জন্য তিনি বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে কথা বলার অনুরোধ করেন। স্পিকার তাকে মাইক দেন।
তাহের বলেন, শোকপ্রস্তাব ‘একপেশে করে তৈরি করা হয়েছে’ এবং ভবিষ্যতে সংসদকে ‘নিরপেক্ষ ও প্রাণবন্ত’ করতে আরও সচেতন হওয়া দরকার। এ সময় তিনি আরও কয়েকজনের নাম বলে সেগুলো শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
তার বক্তব্যে মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আবদুস সোবহান, শেখ আনছার আলী, রিয়াসাত আলী, আবদুল খালেক মণ্ডল, হাফেজা আছমা খাতুন, রোকেয়া আনছার, সুলতানা রাজিয়া, রাশেদা খাতুন, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, এ কে এম ইউসুফ, নাজির আহমেদ, কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা এবং মীর কাসেম আলীর নাম আসে।
তাহের বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রসঙ্গে শোকপ্রস্তাবে ‘জামায়াতে ইসলামী’র বদলে ‘হেফাজতে ইসলামী’ বলা উচিত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহতদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সেখানে ‘প্রায় দুই হাজার শহীদের’ কথা বলেন এবং শরিফ ওসমান হাদীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা যাদের নাম বলেছেন, সেগুলো শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
শোক প্রস্তাবে আরও কিছু নাম সংযোজিত হবে বলে জানান স্পিকার। তারা হলেন- ছালেহা খানম, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, কামাল ইবনে ইউসুফ ও নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু।
এরপর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম আরও কয়েকটি নাম যোগ করার প্রস্তাব দেন। তিনি গৌতম চক্রবর্তী, এম এ মতিন, মুজিবুর রহমান মঞ্জু, আনোয়ারুল হোসেন খান এবং এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারের নাম শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করার কথা বলেন। অন্য কোনো সাবেক সংসদ সদস্য বা বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম বাদ পড়ে থাকলে তা সংসদ সচিবালয়কে জানাতে অনুরোধ করেন।
পরে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ফ্লোর নিয়ে শরিফ ওসমান বিন হাদি, আবরার ফাহাদ এবং ফেলানী খাতুনের নামও শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেন। স্পিকার তখন বলেন, এই নামগুলোও শোকপ্রস্তাবে যুক্ত হবে।
বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস (জর্জ ম্যারিও বেরগোগলিও), ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বরণ্যে নাগরিক ও ব্যক্তি যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের স্মরণ করা হয় শোক প্রস্তাবে।
জুলাই যোদ্ধা আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, শাহারিয়ার খান আনাস, মেহেদি হাসান জুয়েল, ফারহান ফাইয়াজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বরণ্যে নাগরিকদের নামও রাখা হয় শোক প্রস্তাবে।
এরপর প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং শহীদ জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে শোকপ্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়।
তার আগে প্রয়াতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ প্রয়াতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।
এমওএস/কেএসআর