পদ্মা সেতু চালুর পর পাল্টে গেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দৌলতদিয়া ঘাটের চিত্র। এখন ঈদ মৌসুমেও এখানে থাকে না সেই আগের মতো যাত্রী ও যানবাহনের লম্বা সারি এবং যাত্রী ও হকারদের হাঁকডাক।
ঈদে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এ রুটে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে এবার অতিরিক্ত চাপ সামাল এবং ভোগান্তিবিহীন ঈদ উপহার দিতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। এ নৌরুটে ছোট-বড় ১৬টি ফেরি ও ২০টি লঞ্চ চলাচলের পাশাপাশি দৌলতদিয়ায় পোশাক ও সাদা পোশাকে ঘাট এলাকায় থাকবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবে বরাবরের মতো এবারও দৌলতদিয়া প্রান্তের লঞ্চঘাটের পাশাপাশি তিনটি ফেরিঘাট দিয়ে পারাপার হবে যাত্রী ও যানবাহন।
এদিকে ঈদে ঘরমুখো ও ঈদ শেষে কর্মস্থলগামী মানুষের ভোগান্তি লাঘব ও যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ঈদের আগে ও পরে নির্দেশনা অনুযায়ী জরুরি পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাক ব্যতীত সব ধরনের ট্রাক পারাপার বন্ধ থাকলেও ফেরিঘাটের পন্টুনে ইজিবাইক ওঠা-নামা করা ও যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে যানজট তৈরিসহ রয়েছে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা।
অন্যদিকে পদ্মা সেতু চালুর আগে ঈদ মৌসুমে এ রুটে ২৪ ঘণ্টায় দৌলতদিয়া প্রান্ত দিয়ে ৫ থেকে ৭ হাজার যানবাহন পদ্মা নদী পারাপার হলেও সে সংখ্যা এখন কমে এসে দুই হাজারের নিচে। বর্তমানে দৌলতদিয়া প্রান্তের সাত ফেরিঘাটের মধ্যে সচল রয়েছে (৩, ৪ ও ৭) এ তিনটি এবং পাশাপাশি সচল রয়েছে লঞ্চঘাট।
অপরদিকে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের মাধ্যমে যানজট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দালাল, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, মলমপার্টি, যাত্রী হয়রানি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত টিম এবং মৌসুমি টিকিট কাউন্টার ও অবৈধ যানবাহনেও করা হবে কঠোর নজরদারি। সেই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনও নিয়েছে প্রস্তুতি। এছাড়া ঘাট এলাকার সড়কে আলোকসজ্জাসহ যাত্রীদের জন্য থাকবে সুপেয় পানি ও টয়লেটের ব্যবস্থা।
যাত্রী আরিফ ব্যাপারী ও মহসিন মৃধা বলেন, এখন দৌলতদিয়ার আর আগের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয় না। তবে ভাড়া ও নির্দিষ্ট গন্তব্যের যানবাহন নিয়ে ঝামেলা হয়। এসব বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো উচিত। অন্যান্য বারের মতো এবার ভালোভাবে তারা বাড়ি যেতে এবং ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন বলে আশা করছেন।
যানবাহনের চালক সুজন মিয়া, মিন্টু প্রামাণিক ও হাসান মুন্সি বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে ঈদের সময় দৌলতদিয়ায় আর যানজটে আটকে থাকতে হয় না। ফেরিঘাটগুলো ভালো রাখাসহ বহরে থাকা সবগুলো ফেরি ঠিকঠাকভাবে চালালে আশা করছেন এবারও ভোগান্তি হবে না।
ব্যবসায়ী গোলাপ খাঁ বলেন, এখন ঈদের সময় কিছু বাড়তি যাত্রীর দেখা মেলে। তবে আগের মতো যানজট নেই, ব্যবসাও নেই। এখন গাড়ি ও যাত্রীদের জন্য ফেরি বসে থাকে। ফলে ভোগান্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
শ্রমিক নেতা ও জেলা মালিক সমিতির প্রতিনিধি সরোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, এবার ঘাট এলাকায় যাত্রীদের জন্য স্টপেজ অনুযায়ী পর্যাপ্ত গাড়ি রাখা হবে এবং সার্বক্ষণিক মাইকিং করে যাত্রীদের রুট, টিকিট কাউন্টার ও ভাড়া সম্পর্কে জানানো হবে। কাউন্টারে ভাড়ার চার্ট টানানো থাকবে। ফলে কেউ দালালের মাধ্যমে প্রতারিত হবে না এবং কোনো সমস্যা হলে তাদের কন্ট্রোল রুম অথবা ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে সেবা নিতে পারবে যাত্রীরা।
দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট সুপারভাইজার মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ঈদে বাড়তি যাত্রীদের পারাপারে এবার ২০টি লঞ্চ চলাচল করবে এবং প্রতিটি লঞ্চের ফিটনেসের পাশাপাশি দুর্ঘটনার সময় ব্যবহৃত সব সরঞ্জামাদি আছে। প্রশাসনসহ সবার সহযোগিতায় ঈদে ঘরমুখো ও ঈদ-পরবর্তী সময়ে কর্মস্থলগামী যাত্রীদের ভালোভাবে পারাপার করতে সক্ষম হবেন।
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, এবার ছোট-বড় ১৬টি ফেরি দিয়ে দৌলতদিয়া প্রান্তের তিনটি ফেরিঘাট দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করা হবে। জরুরি পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাক ব্যতীত অন্য ট্রাক সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাত্রীবাহী বাস, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস পারাপার করা হবে। এর মাধ্যমে ঈদের আগে ও পরে সব যাত্রী নির্বিঘ্নে আসা-যাওয়া করতে পারবে। ফেরি পারাপারের জন্য নয় এমন গাড়ি যেমন ইজিবাইক পন্টুনে উঠতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে জেলা ও নৌপুলিশের ট্রাফিক বিভাগ কাজ করবে এবং সবার সহযোগিতায় ভালো ঈদযাত্রা উপহার দিতে পারবেন।
রাজবাড়ী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ বলেন, ঈদের সময় ফেরিঘাটে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি পায়। সে ক্ষেত্রে পুরো ঘাট এলাকায় পোশাক ও সাদা পোশাকে তাদের কঠোর নজরদারি ও চেকপোস্ট থাকবে। পাশাপাশি যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং সুশৃঙ্খলভাবে যানবাহন যাতায়াত ও পার্কিংয়ের জন্য কাজ করবে ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্ট।
রুবেলুর রহমান/আরএইচ/জেআইএম