চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী আতিয়া মসজিদ। প্রাচীন স্থাপনাটি সুলতান ও মোগল স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবেই নয় বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার এক জীবন্ত দলিল হিসেবে আজও সমানভাবে গুরুত্ব বহন করছে মসজিদটি।
বাংলাদেশে যে কয়টি প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্য আছে, তার মধ্যে টাঙ্গাইলের আতিয়া মসজিদ অন্যতম। দেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন এ মসজিদ। ১৬০৯ সালে জমিদার বায়েজিদ খান পন্নীর ছেলে সাঈদ খান পন্নী নির্মাণ করেন এটি। প্রায় ৪১৭ বছরের পুরোনো মসজিদটির কারুকাজ এখনো সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এলাকার নামানুসারেই মসজিদের নামকরণ করা হয় আতিয়া মসজিদ। এ মসজিদ ছাড়া এত প্রাচীন মসজিদের সন্ধান টাঙ্গাইলের আর কোথাও পাওয়া যায়নি।
মসজিদটি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান ও বিদেশ থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন। বাংলাদেশের পুরোনো দশ টাকার নোটে আছে মসজিদটির ছবি। যার জন্য মোটামুটি সবার কাছে পরিচিতি মসজিদটি। তবে বর্তমানে দশ টাকার নোটে মসজিদটির ছবি আর দেওয়া হয় না। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগ এ স্থাপনার তত্ত্বাবধান করছে। পুনরায় ১০ টাকার নোটে আতিয়া জামে মসজিদের ছবি দেওয়ার দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, সাড়ে ৭ ফুট প্রশস্ত দেওয়াল বিশিষ্ট আতিয়া মসজিদের দৈর্ঘ ও প্রস্থ যথাক্রমে ৫৯ ফুট ও ৪০ ফুট। চার কোণে চারটি বিরাট অষ্টকোণাকৃতির মিনার আছে। মিনারগুলো ছাদের অনেক ওপরে উঠে ছোট গম্বুজে শেষ হয়েছে। প্রধান কক্ষ ও বারান্দা দু’ভাগে বিভক্ত। প্রধান কক্ষ বর্গাকৃতি। ভেতরটা ২৫ ফুট লম্বা। কক্ষের ওপর চমৎকার একটি গম্বুজ আছে। প্রধান কক্ষের পূর্বপাশে বারান্দা। বারান্দার ওপর তিনটি ছোট গম্বুজ। পূর্ব দেওয়ালে তিনটি প্রবেশপথ এবং সামান্য ওপর দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ একটি মোল্ডিং চলে গেছে।
সুলতানি আমলের মসজিদের মতো পূর্ব দেওয়ালের কার্নিশ ও প্যারাপেট বাকানো। প্যারাপেটের উপরিভাগে ব্যাটলম্যান্ট দ্বারা চিত্রিত। মসজিদের পূর্ব ও উত্তর দিকের বাইরের দেওয়ালে টেরাকোটার ওপর চমৎকার বৃত্তের মাঝে ফুলের নকশা করা হয়েছে। চুন, সুরকির গাঁথুনি দিয়ে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদে সুলতানি ও মোগল আমলের স্থাপত্য শিল্পরীতির নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রাচীন শিল্প-সুষমামণ্ডিত মসজিদটি নির্মাণের পর ১৮৩৭ সালে রওশন খাতুন চৌধুরানী এবং ১৯০৯ সালে আবু আহমেদ গযনবী খান সংস্কার করেন।
ইতিহাস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পঞ্চদশ শতকে এ অঞ্চলে আদম শাহ বাবা কাশ্মীরি নামের সুফি ধর্মপ্রচারক আসেন। ১৬১৩ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এখানে বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। তাঁর কবরও এখানেই অবস্থিত। শাহ কাশ্মীরির অনুরোধে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর সাঈদ খান পন্নীকে আতিয়া পরগণার শাসক নিয়োগ করেন। সাঈদ খান পন্নীই করটিয়ার বিখ্যাত জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে আতিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন।
‘আতিয়া’ শব্দটি আরবি ‘আতা’ শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো ‘দান’। ওই সময় ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয়ভার বহনের জন্য কররানি শাসক সোলাইমান কররানির কাছ থেকে বিশাল একটি এলাকা ‘ওয়াকফ’ হিসেবে পান। এটি দেলদুয়ার উপজেলা তথা টাঙ্গাইল জেলার সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ। সুলতানি ও মোগল আমলের স্থাপত্য শিল্পরীতির সমন্বয়ে নির্মিত মসজিদের পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজে নিযুক্ত ছিলেন স্থপতি মুহাম্মদ খাঁ।
এলাকাবাসী ও ভ্রমণপ্রেমীরা যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে পুনরায় ১০ টাকার নোটে স্থান দেওয়ার দাবি করেন। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের মসজিদটি অত্যন্ত প্রাচীন। এ মসজিদে দূর-দূরান্ত থেকে এবং স্থানীয় লোকজন নামাজ আদায় করে থাকেন। অন্য সময়ে নামাজ পড়তে কোনো সমস্যা হয় না। শুক্রবারে জুমার নামাজ পড়তে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাই মসজিদটি বর্ধিত করতে হবে।’
আরেক বাসিন্দা মো. ফরহাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘মসজিদে কোরআন শরীফ শেখানো হয়। একই সাথে প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। এ হিসেবে মসজিদটি আরও সংস্কার করতে হবে। এমনকি পুনরায় ১০ টাকার নোটে মসজিদের ছবি দেওয়ার দাবিও করছি।’
আতিয়া মসজিদের ইমাম আব্দুল বাছি বলেন, ‘আতিয়া মসজিদটি শুধু টাঙ্গাইলের গর্ব নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মসজিদটি সংরক্ষণ ও সংস্কার প্রয়োজন। একই সাথে দেশের ১০ টাকার নোটে পুনরায় এ মসজিদের ছবি দেওয়ার দাবি করছি।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার জোহরা সুলতানা যূথী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা মসজিদটি পরিদর্শন করেছি। এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকায় আমরা তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ করতে পারছি না। তাদের অনুমতি পেলে আমরা কাজ করতে পারবো। এ ব্যাপারে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।’
যেভাবে যাবেন টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে মসজিদটির অবস্থান। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার পাকুল্লা দিয়ে দেলদুয়ার হয়ে আতিয়ায় যাওয়া যায়। এ ছাড়া টাঙ্গাইল শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে নেমে সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিজার্ভ করে সহজেই আতিয়ায় যাওয়া যাবে।
এমএএএন/এসইউ