বাগেরহাটের রামপালের সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহতের ঘটনায় এখনো থামছে না স্বজনদের আহাজারি। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা আত্মীয়-স্বজনরা একে অপরকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তারা কিছুক্ষণ পরপর কবরস্থানে যাচ্ছেন এবং নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় মোনাজাত করছেন। কেউ কেউ কবরের মাটি ছুঁয়ে কান্না করছেন
পৌর শহরের ছত্তারলেন সংলগ্ন আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ির সামনে মসজিদ থেকে আনা কয়েকটি খাটিয়া পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাড়ির আঙিনায় গভীর নীরবতা।
দুর্ঘটনায় নিহত নববধূ মিতুর বাবা আব্দুস সালাম খুলনার কয়রা থেকে মোংলা কবরস্থানে আসেন। বিয়ের দিনই লাশ হয়েছেন তার মেয়ে। এজন্য কিছুতেই যেন নিজেকে বুঝ দিতে পারছেন না। তবুও মেয়েকে দাফন করে জামাইয়ের কবর দেখতে চলে এসেছেন তিনি।
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমারতো সব শেষ হয়ে গেছে। আমার দুটো মেয়েই হারিয়ে গেলো। আমার বাবা অনেক আগেই মারা গেছে, এখন মা-ও নেই। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।’
তাকে কাছে পেয়ে নিহত আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের সদস্যরা আরও বেশি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
কবরস্থানেই দেখা গেলো দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পরিবারের ৯ সদস্যকে হারানো আশরাফুল রহমান জনিকে। তার হারানোর আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাই এখন কান্নাও আসে না তার। শোকে পাথর তিনি। গাড়ির ভেতর থেকে বের করা স্ত্রী, তিন সন্তান, বাবা, ভাই, বোন, ভাগনে-ভাগনির মরদেহ দেখেছেন তিনি। পরিবারের সবাইকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে পেছনে মোটরসাইকেলে আসছিলেন। তাই প্রাণে বেঁচে গেছেন।
আরও পড়ুন: রামপালে দুর্ঘটনায় নিহত বর সাব্বিরসহ ৯ জনের দাফন সম্পন্নসড়কে পড়ে আছে ফিডার-ভাঙা চশমা ও রক্তাক্ত কাপড়একদিনে ৯ কবর খুঁড়িনি আগে: গোরখোদকস্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ৯ জনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ জনিপরনে লাল শাড়ি-হাতে মেহেদি, বিয়ের সাজেই শেষ যাত্রা
আশরাফুল রহমান জনি বলেন, ‘আসলে আমাদের আর কি বলার আছে! আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। তবে সরকারের কাছে একটা কথা বলতে চাই, খুলনা-মোংলা মহাসড়ক এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। যে কোনো মূল্যে নৌবাহিনীর বাসসহ এই সড়কে চলাচল করা সব যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।’
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। নিহতদের স্বজনরা অভিযোগ করছেন, নৌবাহিনীর স্টাফ বাসটির অতিরিক্ত গতির কারণেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে খুলনা–মোংলা মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে ঘটনার চারদিন পার হলেও এখন পর্যন্ত নিহতের স্বজনরা কোনো মামলা বা অভিযোগ করেননি। তারা অভিযোগ বা মামলা করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান কাটাখালি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাফর আহমেদ।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের গুনাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর স্টাফ বাস ও যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হন। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওইদিন রাতেই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শুক্রবার (১৪ মার্চ) জুমার নামাজের পর জানাজা শেষে বর, বরের বাবা আব্দুর রাজ্জাকসহ ৯ জনের মরদেহ মোংলা কবরস্থানে দাফন করা হয়। নববধূ, তার বোন ও দাদিকে দাফন করা হয় কয়রার নকশা এলাকায়। নানিকে দাফন করা হয় চালনা এলাকায়। মাইক্রোবাসচালকের দাফন সম্পন্ন হয়েছে তার নিজ গ্রাম রামপালে।
আবু হোসাইন সুমন/এসআর/এমএস