আন্তর্জাতিক

এক দেশ, ৩১ যুদ্ধক্ষেত্র: ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’ কৌশল

সম্প্রতি শুরু হওয়া ইরান বনাম ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধে বেশ কোণঠাসা অবস্থায় পড়েছে বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সংকটে একই অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের দখলদার ইসরায়েলের। ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধি, মিত্রদেশের ওপর হামলা শঙ্কা ও পারমাণবিক বোমা তৈরির অভিযোগ এনে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথ হামলার মুখে পড়ে ইরান।

তবে এই যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ মোকাবিলায় ইরান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সুচিন্তিত কৌশল গ্রহণ করেছে। ইরানের মূল লক্ষ্য এই যুদ্ধ নিজেদের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে মার্কিন ব্যয় বৃদ্ধি করে ট্রাম্পকে হটানোর কৌশল নিয়েছে ইরান।

কিন্তু ইসরায়েল-মার্কিন বাহিনীকে পিছুহটাতে আরেকটি ভিন্ন কৌশল নিয়েছে ইরান। এই কৌশলের নাম ‘মোজাইক ডিফেন্স ডকট্রিন।’ এই অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে অদম্য হয়ে উঠেছে ইরানের সামরিক বাহিনী। এই সামরিক শক্তিকে দমানো খোদ ইরানের জন্যেই কষ্টসাধ্য বলে মত দিয়েছে বিশ্লেষকরা।

‘মোজাইক ডিফেন্স ডকট্রিন’ কী

বিকেন্দ্রীকৃত সামরিক কৌশল বুঝাতে এই 'মোজাইক ডিফেন্স ডকট্রিন টার্ম ব্যবহার করা হয়েছে। মোজাইকের ছোট ছোট খণ্ডের সঙ্গে তুলনাযোগ্য ইরানে প্রতিটি প্রদেশকে একেকটি স্বাধীন প্রতিরক্ষা ইউনিটে রূপ দিতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- যুদ্ধকালীন কেন্দ্রীয় কমান্ড ব্যবস্থা ধ্বংস বা বিচ্ছিন্ন হলেও যাতে ইরানের প্রতিটি প্রদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজস্ব শক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।

পাহাড়ের বেষ্টনি দিয়ে ঘেরা ইরানের ভূখণ্ডকে মোজাইক ডিফেন্সের এক অভেদ্য প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা প্রতিটি অঞ্চলকে শত্রুর জন্য একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছে। শত্রু পক্ষের হাতে রাজধানী তেহরান দখল হওয়া মাত্রই প্রদেশগুলোর ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ইউনিটগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন সামরিক সত্তা হিসেবে কাজ শুরু করবে।

এই অধ্যাদেশে কৌশলগুলো হচ্ছে-প্রক্সি নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা, সময়মত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ, ড্রোন প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি,স্পিডবোট ও নৌ-মোজাইক, বাসিজ মিলিশিয়া (বিশাল আধাসামরিক বাহিনী) ইত্যাদি।

সাদ্দামের পতন ও অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধের ধারণা:

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর হামলায় সাদ্দাম হোসেনের প্রথাগত বাহিনীর দ্রুত পতন হয়। ইরাকের এই পতনের মূল কারণ দেশটির সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছে ইরান।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে জয় পাওয়া প্রায় অসম্ভব মনে হলে যুক্তরাষ্ট্র যাতে জয় না পাই সে পরিকল্পনা সাজানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে আইআরজিসি-র তৎকালীন প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ জাফারি অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধের ধারণাটি প্রবর্তন করেন।

৩১ সামরিক অঞ্চলে ভাগ:

অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধের কৌশলের অধীনে ইরানের ৩১টি প্রদেশকে আলাদা আলাদা সামরিক ভাগ করা হয়েছে। এই প্রদেশগুলোর প্রশাসনিক প্রধান প্রত্যেকের কাছে নিজস্ব অস্ত্রাগার, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে শত্রুপক্ষ রাজধানী দখল করলেও প্রতিটি শহর বা পাহাড়ি অঞ্চলে তাদের শত শত ক্ষুদ্র ও বিধ্বংসী ইউনিটের মুখোমুখি হতে হবে।

সূত্র: আল-জাজিরা/সিএনএন/দ্য গার্ডিয়ান/তাসনিম নিউজ এজেন্সিকেএম