অর্থনীতি

ক্রেতা ধরে রাখতে ‘টুকিয়ে টুকিয়ে’ সয়াবিন তেল এনে বিক্রি করছেন দোকানিরা

‘কোম্পানি সয়াবিন তেল দেয় না, টুকিয়ে টুকিয়ে তেল এনে বিক্রি করছি’- কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর রামপুরার হাজিপাড়া বউবাজারের ওসমান স্টোরের মালিক তাজুল ইসলাম।

মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) বিকেলে তিনি জাগো নিউজকে আরও বলেন, ঈদের কেনাবেচা শুরু হয়েছে। দোকানে তেল না থাকলে রেগুলার কাস্টমার অন্য দোকানে চলে যাবে। ওইসব কাস্টমারের জন্য নিজে পরিবহন খরচ দিয়ে চকবাজার থেকে পাইকারি তেল কিনে বিক্রি করছি।

এসময় অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে তাজুল ইসলাম বলেন, আগে কোম্পানিগুলো দোকান থেকে অর্ডার নিয়ে তেল সরবরাহ করতো। এখন সেটা বন্ধ।

শুধু বউবাজার এলাকা নয়, গত প্রায় এক মাস ঢাকার বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট চলছে। রাজধানীর অনেক স্থানেই বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এখন খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিনের দাম (বোতলের গায়ের দাম) বাড়েনি। কিন্তু সংকটের কারণে বোতলপ্রতি ৫ থেকে ২০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ডিলার বা সরবরাহকারী পর্যায়ে দাম বেড়েছে।

বোতলজাত তেলের সংকটে বেড়েছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, মাসখানেক ধরেই বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ তুলনামূলক কম। ঈদের বাড়তি চাহিদায় গত তিন-চার দিনে এ সংকট আরও বেড়েছে।

তারা বলছেন, একদিকে তেল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে তুলনামূলক কম পরিমাণে তেল বাজারে আসছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আতঙ্ক থেকে অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন। সব মিলিয়ে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে।

হাজিপাড়া বউবাজারের আরেক দোকান ফরিদ স্টোরে প্রতি দুই লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছিল ৪০০ টাকায়। যদিও বোতলের গায়ের দাম ৩৯০ টাকা। ওই দোকানের বিক্রেতা জানান, এখন পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে তেল সবোর্চ্চ খুচরা মূল্য অর্থাৎ গায়ের দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে সেখান থেকে কিনে তারা লিটার প্রতি ৫ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করছেন।

ওই দোকানে খুচরা সয়াবিন প্রতি লিটার ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, অর্থাৎ বোতলের চেয়েও ১০ টাকা বেশি দরে। দোকানি বলেন, পাইকারি বাজারে খোলা তেল ২০৩ টাকা লিটার বিক্রি হচ্ছে।

আরও পড়ুনইরান যুদ্ধের অজুহাতে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা যে কারণে তেলের দাম আপনার ধারণার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ 

হাজিপাড়াসহ মালিবাগ এলাকার বেশিরভাগ মুদিদোকানে ৫ লিটারের সয়াবিন তেল পাওয়া গেলেও তা পরিমাণে কম। তবে ১ ও ২ লিটারের বোতল হাতে গোনা কিছু দোকানে মিলছে।

মালিবাগের কুমিল্লা জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী ফজলু মিয়া বলেন, তেলের অবস্থা খুব খারাপ। দু-তিন দিন আগেও ডিলারের কাছ থেকে মোটামুটি তেল পাওয়া যেত। এখন বোতলের সয়াবিন তেল নেই বললেই চলে। আমরা বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তেল সংগ্রহ করছি, যারা আগে কিনে স্টক রেখেছিলেন।

তিনি বলেন, বড় বড় ব্যবসায়ীদের কথা আলাদা। তারা নিয়মিত ব্যবসা করেন বলে কোম্পানি তাদের তেল দেয়।

অধিকাংশ খুচরা বিক্রেতা জানান, পাইকারির বড় দোকান থেকে আগে ৮-১০ কার্টন তেল মিললেও এখন ১-২ কার্টন এনে বিক্রি করছেন।

গত বছরের ৭ ডিসেম্বর সর্বশেষ বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়ে। তখন প্রতি লিটারে ৬ টাকা বাড়িয়ে এক লিটারের বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ হয় ১৯৫ টাকা এবং ৫ লিটারের দাম হয় ৯৫৫ টাকা। এরপর কোম্পানিগুলো আর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বাড়ায়নি।

তবে সম্প্রতি ডিলার বা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা যে দরে তেল কেনেন, সেটি বেড়েছে। তাতে খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা কমেছে। এতে অনেক খুচরা বিক্রেতা বাড়তি দামে সয়াবিন তেল বিক্রি করছেন।

যদিও ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো বাজারে তেলের সরবরাহ-সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ভোজ্যতেলের উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে একজন জাগো নিউজকে বলেন, মিল গেট থেকে সরবরাহ কমেনি। তেলের উৎপাদন ও মজুতও ঠিক আছে। বরং ক্রেতারা বেশি বেশি কিনছেন, খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারাও মজুত রাখছেন।

এনএইচ/কেএসআর