জাতীয়

সংগ্রাম কমিটি গঠন, প্রতিরোধে জেগে ওঠে ঢাকা

১৯৭১ সালের ১৮ মার্চ ঢাকায় বিমান বাহিনীর সাবেক বাঙালি সৈনিকরা স্বাধীনতার আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন। করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো জানান, শাসনতান্ত্রিক প্রশ্নে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসার প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এদিকে ১ মার্চ থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাসভবনটি পরিণত হয় দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী জনগণের পরিচালন কেন্দ্রের পাশাপাশি এটি হয়ে ওঠে মুক্তিকামী মানুষের মহামিলন ক্ষেত্র। দিনভর মিছিল শেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানাতে সেখানে সমবেত হন।

সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকের ফাঁকে ফাঁকে শেখ মুজিবুর রহমান বারবার উঠে এসে সমবেত জনতার উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি বলেন, বিদেশি বন্ধুদের উদ্দেশে জানাতে চান—বাংলার মানুষ প্রতিজ্ঞায় অটল, সংগ্রাম ও ত্যাগে উজ্জীবিত।

‘স্বাধীনতার জন্য জীবনদানের অগ্নিশপথে দীপ্তজাগ্রত জনতার এ জীবন জোয়ারকে, প্রচণ্ড গণবিস্ফোরণকে স্তব্ধ করতে পারে—এমন শক্তি মেশিনগানেরও আজ আর নেই,’ বলেন তিনি।

জনগণের প্রতি চূড়ান্ত প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ঘরে ঘরে সংগ্রামী দুর্গ গড়ে তোলো। আঘাত এলে প্রতিহত করো, শত্রুর ওপর পাল্টা আঘাত হানো।’ সাত কোটি বাঙালির মুক্তি না আসা পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

এদিন তার বাসভবনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অতিরিক্ত সৈন্য আনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার দেশের মাটিতে যা কিছু ঘটছে তার সব খবরই আমি রাখি।’

রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছিল তৎপরতা। শেখ মুজিবুর রহমান ও ওয়ালী ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খান এক ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৈঠকে পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি গাউস বক্স বেজেঞ্জো উপস্থিত ছিলেন। রাতে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়, পরদিন বেলা ১১টায় প্রেসিডেন্ট ভবনে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যে রাজনৈতিক সংকট নিয়ে তৃতীয় দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে তেজগাঁও ও মহাখালী এলাকায় শ্রমিকবোঝাই ট্রাকে সেনাসদস্যদের হামলার অভিযোগ পাওয়া যায়। নিরস্ত্র আরোহীদের প্রহার ও অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় নগরীতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ঘটনার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম এক বিবৃতিতে উসকানিমূলক আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, নিরস্ত্র মানুষের ওপর আঘাত সহ্য করা হবে না এবং এর দায় উসকানিদাতাদেরই বহন করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে তারবার্তা পাঠিয়ে সম্ভাব্য গণহত্যা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি রোধে পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিবৃত্ত করার আহ্বান জানায়।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের জন্য খাদ্যশস্যবাহী ‘ইরনা এলিজাবেথ’ নামের একটি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে চট্টগ্রামের বদলে করাচিতে নেওয়া হয়।

তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর ‘৭১ এর দশমাস’, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংবাদপত্র

এমএএস/বিএ