জাতীয়

হাতিরঝিলে নীরবতা, যাত্রী নেই নৌকায়ও

বুধবার বিকেল ৩টা। রাজধানীর হাতিরঝিলের ওয়াটার বোট টিকিট কাউন্টার প্রায় ফাঁকা। কাউন্টারে বসে থাকা দুই তরুণ গল্পে মশগুল। অদূরে বেঞ্চে বসে ঝিমাচ্ছেন দুজন নিরাপত্তারক্ষী। পুরো এলাকায় যেন এক ধরনের অস্বাভাবিক নীরবতা।

কিছুক্ষণ পর এক তরুণী এসে বাড্ডা যাওয়ার টিকিট সংগ্রহ করে টার্মিনালের দিকে এগিয়ে যান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চার-পাঁচটি বোট ফাঁকা অবস্থায় নোঙর করে আছে। কোনো বোটেই চালক বা কর্মীদের উপস্থিতি নেই। টার্মিনালে মোটে পাঁচ থেকে ছয়জন যাত্রী অপেক্ষা করছেন।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন অপেক্ষমাণ যাত্রী নার্গিস আক্তার। তিনি মগবাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত। বাসা মধ্য বাড্ডায়। নিয়মিত এই রুটেই যাতায়াত করেন।

তিনি বলেন, অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ কারওয়ান বাজার স্টেশনে এক ধরনের ভূতুড়ে পরিবেশ। যাত্রী খুব কম হওয়ায় বোট ছাড়তে দেরি হবে বলে জানিয়েছে টিকিট বিক্রেতা। সাধারণত ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই বোট পূর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু আজ কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে বুঝতে পারছি না। প্রায় যাত্রীশূন্য টার্মিনালে একটু ভয়ও লাগছে।

ঈদুল ফিতর সামনে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আর মাত্র দু-একদিন পরই ঈদ। এবারের ঈদে সরকারিভাবে সাতদিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে নাড়ির টানে লাখো মানুষ রাজধানী ছেড়ে গ্রামের বাড়ির পথে রওয়ানা হয়েছেন। ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ঢাকা শহর। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে হাতিরঝিলের ওয়াটারবোট সেবায়।

হাতিরঝিল, গুলশান, রামপুরা ও বাড্ডা রুটে চলাচলকারী ওয়াটার বোট একসময় জনপ্রিয় গণপরিবহন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কম খরচ, সময় সাশ্রয় এবং যানজট এড়ানোর সুবিধার কারণে প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার যাত্রী এই সেবা ব্যবহার করতেন। কিন্তু ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে সেই চিত্র একেবারেই বদলে গেছে।

কারওয়ান বাজার এলাকার ইজারাদার পরিচয়দানকারী আজিজুর রহমান বলেন, ‘গত দু-তিনদিন ধরেই যাত্রী অনেক কম। আগে যেখানে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ হাজার যাত্রী চলাচল করত, এখন তা নেমে এসেছে ৪০০ থেকে ৫০০ জনে। নিয়মিত ১৫টি বোট চলাচল করলেও এখন যাত্রী কম থাকায় হাতে গোনা কয়েকটি বোট চালানো হচ্ছে।’

তবে তিনি আশাবাদী, ঈদের দিন থেকে আবারও যাত্রী সংখ্যা বাড়বে। ঈদের সময় শুধু যাতায়াত নয়, বিনোদনের জন্যও অনেক মানুষ পরিবার নিয়ে হাতিরঝিলে ঘুরতে আসেন, বলে জানান তিনি।

বিকেল সাড়ে ৩টায় বাড্ডা ওয়াটার বোট টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন যাত্রী টিকিট কেটে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু সেখানে কোনো বোট নেই।

মোতালেব হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, এখানে এখন কোনো বোট নেই। হাতিরঝিল থেকে যাত্রী নিয়ে বোট আসলেই আমরা যেতে পারবো বলে টিকিট বিক্রেতা আগে থেকেই জানিয়েছেন।

যান্ত্রিক ইট-পাথরের এই ব্যস্ত নগরী ঈদের আগে যেন অন্য এক রূপ ধারণ করেছে। যে হাতিরঝিল প্রতিদিন হাজারো মানুষের কোলাহলে মুখর থাকে, সেখানে এখন নেমে এসেছে অদ্ভুত এক নীরবতা।

ঈদের আনন্দে রাজধানী ফাঁকা হওয়ায় সাময়িকভাবে থমকে গেছে ব্যস্ত জীবনের ছন্দ। সেই ছন্দপতনের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে হাতিরঝিলের ওয়াটার বোটে—যেখানে আজ যাত্রী নেই, আছে শুধু অপেক্ষা আর নীরবতা।

এমইউ/এমআইএইচএস