ক্যাম্পাস

ইবিতে উপাচার্য পরিবর্তনের গুঞ্জন, আলোচনায় বিএনপিপন্থি ৭ শিক্ষক

দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শীর্ষ পদে পরিবর্তনের হাওয়ায় এবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও (ইবি) উপাচার্য পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী অভিভাবক হিসেবে কে আসছেন তা নিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে-বাইরে চলছে নানা সমীকরণ ও বিশ্লেষণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে উপাচার্য হওয়ার দৌড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত সাতজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের নাম সামনে আসছে। মূলত বিএনপিপন্থি শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরাই এখন পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। তবে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও উপাচার্য নিয়োগের আলোচনা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপাচার্য হওয়ার আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানূর রহমান, ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আলীনূর রহমান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন, লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. নজিবুল হক এবং আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. তোজাম্মেল হোসেন। আরও আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান উপ উপাচার্য এবং আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলী।

আলোচিত শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক ড. আলীনূর রহমান যোগদানের দিক থেকে সবচেয়ে সিনিয়র শিক্ষক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর, প্রভোস্ট, চেয়ারম্যান, ডিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয় জিয়া পরিষদ ও শিক্ষক সমিতির নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের কোষাধ্যক্ষ ও ভাইস-চেয়ারম্যান ছিলেন।

আলোচিত আরেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. মিজানূর রহমান চারবারের শিক্ষক সমিতির সভাপতি। ছিলেন জিয়া পরিষদের সভাপতি। দক্ষিণ কোরিয়া ও আর্মেনিয়ার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।

অধ্যাপক এমতাজ হোসেন কলা অনুষদের সাবেক ডিন, জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় মহাসচিব, একবারের শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং ইউট্যাবের সদস্য।

অধ্যাপক মতিনুর রহমান সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন, সাদা দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, ইউট্যাবের কার্যনির্বাহী সদস্য ও একবার শিক্ষক সমিতির সভাপতি।

আলোচিত আরেক শিক্ষক অধ্যাপক তোজাম্মেল হোসেন ইউট্যাবের ইবি শাখার সভাপতি, দীর্ঘদিন জিয়া পরিষদের সভাপতি, একবার শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং ঢাবির নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সাবেক ছাত্রনেতা।

অন্যদের মধ্যে অধ্যাপক নজিবুল হক ও অধ্যাপক এয়াকুব আলী শিক্ষক সমিতি ও জিয়া পরিষদের সাবেক সভাপতি। এয়াকুব আলী বর্তমানে উপ-উপাচার্য এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা।

উপাচার্য পদে আলোচনার বিষয়ে অধ্যাপক মিজানূর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘উপাচার্য পদে নাম আসা বা পদের জন্য লবিং করার কোনো অভ্যাস আমার নেই। তবে সরকার যদি যোগ্য মনে করে আমাকে দায়িত্ব দেয়, তাহলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলাই হবে আমার মূল লক্ষ্য।’

উপাচার্য নিয়োগের আলোচনায় নিজের নাম আসা প্রসঙ্গে সোজাসাপ্টা মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক ড. আলীনুর রহমান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘পদের জন্য লবিং বা তদবির করার কোনো ইচ্ছা বা মানসিকতা আমার নেই। তেলবাজি বা তদবির করে পদ পাওয়ার চেয়ে সততার সঙ্গে থাকা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে কর্তৃপক্ষ যদি আমাকে দায়িত্ব দেয়, তাহলে আমি তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবো।’

তবে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভিসি পদের মতো বড় দায়িত্ব বা মানসিক চাপ নেওয়ার সক্ষমতা এখন আমার শরীরের নেই। এমনকি একটানা দেড়-দুই ঘণ্টা টেবিলে বসে কাজ করার মতো অবস্থাও আমার নেই। আমি আসলে শান্তিতে বাঁচতে চাই। তাই এ ধরনের কোনো বড় দায়িত্বে আমি যেতে চাচ্ছি না।’

জানতে চাইলে লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘উপাচার্য পদে পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তবে একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বলতে চাই, দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছি। প্রক্টর, প্রভোস্ট, ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের চেষ্টা করেছি। আমি সবসময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি। সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনেও সামনের সারিতে থেকে ভূমিকা রেখেছি। দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছা ও সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়।’

একই বিষয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. নজিবুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘উপাচার্য হওয়ার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা পদের পেছনে ছোটার স্বভাব আমার নেই। দায়িত্ব দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তবে আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন ছাড়া জাতি এগোতে পারবে না।’

অধ্যাপক তোজাম্মেল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার যদি আমাকে উপাচার্যের দায়িত্ব দেয়, আমার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সেশনজটমুক্ত একটি সুন্দর শিক্ষা জীবন উপহার দেওয়া।’

বর্তমান উপ-উপাচার্য এবং আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক এম এয়াকুব আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘উপাচার্য পদের জন্য আমি কোনো মন্ত্রী বা প্রভাবশালীর কাছে তদবির করতে রাজি নই। আমি পদের লোভে নয়, বরং মেধা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনে বিশ্বাসী।’

এ সাত শিক্ষকের নাম নিয়ে জোর আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কার কাঁধে এই দায়িত্ব অর্পণ করা হবে, তা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এসআর/এএসএম