মতামত

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মামলা বাণিজ্য

মামলা বাণিজ্য আমাদের দেশে একটি পরিচিত ব্যাপার। কখনও এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা করে, কখনও ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালীরা করে। দেশের আলোচিত ২০২৪ সালের জুলাই-আন্দোলনের পরের সরকারের বিরুদ্ধেও এই মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা।

এ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি সরকার বিদায় নিয়েছে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, এবং জনগণের প্রত্যাশা নতুনভাবে উত্থাপিত হয়েছে। কিন্তু যে পরিবর্তন ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছিল, সেই প্রত্যাশার একটি বড় অংশ আজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে ‘মামলা-বাণিজ্য’ নামক এক ভয়াবহ প্রবণতার কারণে। গণঅভ্যুত্থানের পর দায়ের হওয়া অসংখ্য মামলার ভেতরে যে অনিয়ম, অপব্যবহার ও ব্যক্তিস্বার্থের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা শুধু বিচারব্যবস্থাকেই নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

একটি জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলো কেন্দ্র করে দখল, প্রতিহিংসা, চাঁদাবাজি এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য নিরীহ মানুষদের ‘ইচ্ছেমতো’ আসামি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন প্রধানীয়ার ঘটনা এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার, একাধিক মামলায় জড়ানো, রাজনৈতিক পরিচয়জুড়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে একটি সুপরিকল্পিত হয়রানির চিত্র ফুটে ওঠে। অথচ বাস্তবে তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না। একটি ঘটনার জন্য তিনটি মামলা দায়ের এবং প্রতিটিতে তাকে আসামি করা—এটি শুধু আইনি বিচ্যুতিই নয়, বরং আইনের অপব্যবহারের এক নির্মম উদাহরণ।

এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। অন্তত ১০০টি মামলার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শত শত মানুষকে ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে, যাদের অনেকেই ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন। ব্যক্তিগত শত্রুতা, ব্যবসায়িক বিরোধ, জমি দখল কিংবা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে মানুষকে মামলায় জড়ানোর প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এমনকি মৃত ব্যক্তিকেও আসামি করার ঘটনা ঘটেছে, যা বিচারব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের উপহাস বলেই প্রতীয়মান হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মামলাগুলোর একটি বড় অংশে বাদীরাও পরে স্বীকার করছেন যে, তারা অনেক আসামিকে চিনতেন না বা ভুলবশত নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। প্রায় অর্ধশত মামলায় ছয় শতাধিক আসামির নাম বাদ দেওয়ার আবেদন আদালতে জমা পড়েছে। এর পেছনে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে—২০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ, মামলা একটি ‘বাণিজ্যিক পণ্য’ হয়ে উঠেছে, যেখানে নির্দোষ মানুষকে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মী, অসাধু আইনজীবী, পুলিশের একটি অংশ এবং মধ্যস্বত্বভোগী চক্র—সব মিলিয়ে একটি ‘মামলা ইকোসিস্টেম’ গড়ে উঠেছে। গ্রেফতারের পর জামিন পেলেও অন্য মামলায় পুনরায় গ্রেফতার দেখানোর মাধ্যমে এই চক্র তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে একজন নিরপরাধ ব্যক্তি একবার মামলার ফাঁদে পড়লে তার জন্য মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনছে না, বরং সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যারা প্রকৃত অপরাধী, তারা অনেক সময় আড়ালে থেকে যাচ্ছে, আর নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। এতে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। শহীদদের স্বজনদের মধ্যেও এই নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে, যদি এভাবে মামলার অপব্যবহার চলতে থাকে।

রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানও এই সংকটের গভীরতা নির্দেশ করে। জুলাই-সংশ্লিষ্ট মোট মামলা হয়েছে ১,৮৪১টি, যার মধ্যে ৭৯১টি হত্যা মামলা। কিন্তু অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে খুবই সীমিত সংখ্যক মামলায়। বিপুল সংখ্যক মামলায় তদন্ত চলমান, এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, শুরু থেকেই মামলাগুলোর একটি বড় অংশ ছিল দুর্বল বা উদ্দেশ্যমূলক।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে বলা হয়েছিল—যাচাই ছাড়া গ্রেফতার করা হবে না, তদন্ত চলাকালে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের কোনো লক্ষ্মণ দেখা যায়নি। কারণ, সমস্যাটি কাঠামোগত এবং গভীরভাবে প্রোথিত। অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভেতরে জবাবদিহির অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা—সব মিলিয়ে এই সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রধান দায়িত্বই হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং বিচারব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করা। কিন্তু যদি সেই সরকারের আমলেই মামলা-বাণিজ্য, হয়রানি ও অপব্যবহার চলতে থাকে, তবে তা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই বিশ্বাসঘাতকতার কাজটিই সূচারুভাবে করেছে।

এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের দায়িত্ব সেই হয়রানিমূলক মামলাগুলো খুঁজে বের করে একটা বিহীত করা। এখানে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যারা ইচ্ছাকৃতভাবে নিরীহ মানুষকে মামলায় ফাঁসিয়েছে, তাদের কী হবে? শুধু নির্দোষ ব্যক্তিদের অব্যাহতি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং যারা এই অন্যায়ের নেপথ্যে রয়েছে—মিথ্যা অভিযোগকারী, সুবিধাভোগী চক্র কিংবা প্রভাব খাটিয়ে মামলা সাজানো ব্যক্তিরা—তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। নিরীহ মানুষকে ফাঁসানো বা হয়রানি করার অধিকার কারও নেই।

এ ধরনের অপরাধকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে দমন করতে না পারলে এই প্রবণতা কখনোই বন্ধ হবে না। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের ভূমিকাও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি—কোনো বিশেষ অভিসন্ধি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা প্রশাসনিক গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে। মানুষকে অন্যায়ভাবে ফাঁসানোর পরিণতি যে ভয়াবহ—এই বার্তাটি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।

নতুন সরকারের উচিত প্রথমেই এই সমস্যাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা এবং একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। প্রথমত, সব জুলাই-সংশ্লিষ্ট মামলার একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠন করে মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, যেসব মামলায় নির্দোষ ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেগুলো দ্রুত প্রত্যাহার বা সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, মামলাকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেন, চাঁদাবাজি বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভেতরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তদন্ত কর্মকর্তাদের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা, নিয়মিত তদারকি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই প্রবণতা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার সংস্কারও জরুরি, যাতে মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত হয় এবং দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে কেউ বাণিজ্য করতে না পারে।

প্রযুক্তির ব্যবহারও এই ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করে প্রতিটি মামলার অগ্রগতি স্বচ্ছভাবে পর্যবেক্ষণ করা গেলে অনিয়ম কমানো সম্ভব। পাশাপাশি, ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ভয় বা চাপ ছাড়াই ন্যায়বিচার চাইতে পারেন।

সবচেয়ে বড় কথা, একটি নৈতিক অবস্থান নিতে হবে—রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে, মামলা কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা ব্যবসার হাতিয়ার হতে পারে না। এটি ন্যায়বিচারের একটি মাধ্যম, যা কেবল সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই ব্যবহার করা উচিত।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার দাবিতে একটি সম্মিলিত আন্দোলন। সেই আন্দোলনের চেতনা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন বিচারব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ ও মানবিক হবে। মামলা-বাণিজ্যের মতো অনৈতিক প্রবণতা যদি এই ব্যবস্থাকে গ্রাস করে, তবে সেই চেতনা ধ্বংস হয়ে যাবে।

অতএব, নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা—তারা দ্রুত, দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। নিরপরাধ মানুষের হয়রানি বন্ধ করবে, প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। কারণ, একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার আইন ও ন্যায়বিচারের ওপর নির্ভর করে। সেই ভিত্তি যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে কোনো উন্নয়নই স্থায়ী হবে না।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো—মামলাকে বাণিজ্যে পরিণত করার এই সংস্কৃতি ভেঙে ফেলা। এটি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারও। নতুন সরকার সেই অঙ্গীকার কতটা পালন করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এবং জনগণের আস্থা। শুধু খাল কাটলেই হবে না, দেশের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কুমিরদের শায়েস্তা করার উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে কুমিরেরাই খালের দখল নিতে পারে!

এইচআর/এমএস