‘আমরা গরিব মানুষ। দিন আনি দিন খাই। বাজারে গোস্তের যে দাম, তাতে কিনে খাওয়া যায় না। সমিতিতে প্রতি সপ্তাহে ৫০ টাকা করে জমা দিছিলাম। সারা বছরের জমানো টাকায় প্রায় চার কেজি গোস্ত পাইছি। ঈদে বউ ছোয়ালপাল নিয়ে খাব।’
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকালে একগাল হাসি দিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর দিনমজুর মো. রইচ উদ্দিন (৫৫)। তিনি উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার ভাষ্য, সমিতির প্রতি কেজি মাংসের দাম পড়েছে ৬৫০ টাকা।
একই গ্রামের ইজিবাইক চালক আমিরুল ইসলাম বলেন, বাজারে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৭৫০-৮০০ টাকা। সংসারের খরচ মিটিয়ে সবাই কিনে খেতে পারে না। তাই ৩০ জনের একটি সমিতি করেছি। প্রতি সপ্তাহে কেউ ৫০ টাকা, আবার কেউ ১০০ টাকা করে জমা দিয়েছিল। কেউ ৪ কেজি আবার কেউ ৮ কেজি করে মাংস পেয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গেলো কয়েক বছর যাবৎ দেশের বাজারে গরুর মাংসের দাম নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে রয়েছে। ফলে বাজার থেকে মাংস কিনে পরিবারের সদস্যদের আমিষের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়ে পড়েছেন পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তিরা। তাই আমিষের চাহিদা পূরণ ও ঈদে পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে কুমারখালী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ২০ থেকে ৩০ জন মিলে তারা গড়ে তুলছেন সমিতি। যা মাংস সমিতি নামে পরিচিত।
সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে সাধ্য অনুযায়ী ৫০-১০০ টাকা করে সমিতিতে জমা দেন। বছর শেষে যে টাকা জমা হয় তা দিয়ে ঈদের কয়েক দিন আগে থেকে চলে গরু কেনা ও কাটাকাটির প্রস্তুতি। কোনো সমিতি আবার সরাসরি কসাইয়ের কাছ থেকে মাংস বায়নায় কিনে সদস্যদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেন। সাধারণত ৫০ টাকা করে জমা দেওয়া সদস্যরা ৪ কেজি করে এবং ১০০ টাকা করে জমা দেওয়া সদস্যরা প্রায় ৮ কেজি করে মাংস পেয়ে থাকেন। প্রায় ছয় থেকে সাত বছর ধরে চলে আসা এমন সমিতির মাংস পেয়ে খুশি সদস্য ও পরিবারের সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে উপজেলার যদুবয়রা, পান্টি, বাগুলাট, চাপড়া, নন্দলালপুর ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখা যায়, কেউ মাংস কাটছে। কেউ কষছে পরিমাপের হিসাব। কেউ আবার মাংস ওজন করে ব্যাগে ভরছে। তাদের ঘিরে অধীর আগ্রহে বসে ও দাঁড়িয়ে আছেন সমিতির অন্যান্য সদস্যরা।
এসময় কুমারখালী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সিএনজি চালক গফুর শেখ (৪৫) বলেন, দিনে ৬০০ টাকা আয় করে ৭৫০ টাকা দিয়ে গরুর মাংস কেনা সম্ভব হয় না। তাই গ্রামের সমিতিতে মাসে ৫০০ টাকা করে জমা দিছিলাম। প্রায় ৯ কেজি মাংস পেয়েছি। যা ফ্রিজে রেখে কয়েক মাস ধরে খাওয়া যাবে।
পৌরসভার তেবাড়িয়া গ্রামে অন্তত তিনটি মাংস সমিতি রয়েছে। তার মধ্যে একটির উদ্যোক্তা শহিদুল ইসলাম (৬৮)।
তিনি জানান, ছয় বছর ধরে এই সমিতি পরিচালনা করছেন তিনি। এ বছর তার সমিতির সদস্য সংখ্যা ১৫০। সদস্যরা মাসিক ৪০০ টাকা করে সমিতিতে প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা জমা করেছেন। জমার টাকায় ৬টি ষাঁড় গরু কেনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ৬ গরুতে প্রায় ৩০ মণ মাংস হতে পারে। তার ভাষ্য, বাজারের চেয়ে সমিতির মাংসে প্রতি কেজিতে ৭০-১০০ টাকা লাভ হয়।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে প্রতিটি গ্রামে প্রায় দুই থেকে তিনটি গরু জবাই করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ সারাবছর ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে এমন আয়োজন করে। সমিতিতে প্রতি কেজি মাংসের দাম পড়ছে ৬৬৫ থেকে ৬৭০ টাকা কেজি।
তার ভাষ্য, এ উপজেলায় ২০০টি গ্রামে এ ধরনের মাংস সমিতির উদ্যোগে অন্তত ৬০০টির বেশি গরু জবাই হয়েছে। যার বাজারমূল্য ছয় থেকে সাত কোটি টাকারও বেশি।
গ্রামবাসীর এমন আয়োজনে খুশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, এভাবে সবাই মিলেমিশে সঞ্চয়ের প্রবাণতা বৃদ্ধি করলে বাজারে চাপ কমবে। পাশাপাশি বাজারে মাংসের দামও কমবে। এ ধরনের সমিতি আরও বেশি বেশি গড়ে তোলা উচিত।
আল-মামুন সাগর/এফএ/এমএস