ধর্ম

ঈদুল ফিতর: নতুন জীবনের উদ্বোধন

মওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান

রোজার মাস শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আসে ঈদের দিন। এক মাসের সংযমী জীবনের পর মুসলমানরা আবার স্বাভাবিকভাবে খাবার খায়। তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে জামাতের সাথে দুই রাকাত ঈদের নামাজ আদায় করে। একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, আনন্দ ভাগাভাগি করে এবং সদকা ও ফেতরা দেওয়া মাধ্যমে গরিব মানুষকে সাহায্য করে।

এসব কার্যক্রম ঈদের মূল স্পিরিট প্রকাশ করে। ঈদের মূল স্পিরিট হলো আল্লাহকে স্মরণ করা। নিজের আনন্দের সঙ্গে অন্যের আনন্দে শরিক হওয়া, নিজের লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি অন্যের অধিকার আদায় করা এবং এমন এক পৃথিবী নির্মাণের জন্য কাজ করা—যা মানুষের জন্য আনন্দময় ও কল্যাণময় হবে।

রমজান মাস ছিল প্রস্তুতি ও আত্মপরিচর্যার সময়। তার পর ঈদ আসে নতুন সংকল্প ও নতুন উদ্দীপনার সঙ্গে জীবন শুরুর বার্তা নিয়ে। এই দিন নতুন উদ্যমে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দিন। রোজা যদি এক ধরনের স্থিরতা হয়, তবে ঈদ সেই স্থিরতার পর আবার অগ্রসর হওয়ার সূচনা।

রোজা ছিল নিজেকে সংযত করে নেওয়ার সময়, আর ঈদ হলো নতুন করে প্রসারিত হওয়া ও এগিয়ে যাওয়ার সময়। রোজার মাসে মানুষ সাময়িকভাবে দুনিয়া ও দুনিয়ার ভোগবিলাস থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। এমন কি নিজের স্বাভাবিক প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও সে সংযম অবলম্বন করেছিল। আসলে এটি ছিল প্রস্তুতির এক বিশেষ মুহূর্ত।

এই প্রস্তুতির উদ্দেশ্য ছিল—মানুষ যেন বাহ্যিক দিকের পরিবর্তে নিজের অন্তরের দিকে দৃষ্টি দেয়। জীবনের সংগ্রামে প্রয়োজনীয় গুণাবলি যেন নিজের মধ্যে গড়ে তোলে—যেমন ধৈর্য, সহনশীলতা, সংযম এবং নেতিবাচক প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এই কঠোর প্রশিক্ষণের একটি মাস শেষ করে মানুষ আবার জীবনের ময়দানে ফিরে আসে এবং ঈদের আনন্দের মাধ্যমে জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

রোজা মানুষের মধ্যে যে প্রকৃত গুণাবলি সৃষ্টি করে, তার ফলে সে সমাজের একজন উত্তম সদস্যে পরিণত হয়। সে নিজের কাছে যেমন একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠে, তেমনই অন্যদের কাছেও ভালো মানুষ হয়ে ওঠে।

রোজার সময় সে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করেছিল; এখন বাইরে এসে মানুষের কাছ থেকে আসা অস্বস্তিকর আচরণও ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করতে শেখে। রোজায় সে নিজের ঘুম ও জাগরণের অভ্যাস বদলেছিল; এখন বৃহত্তর মানবিক কল্যাণের জন্য নিজের ইচ্ছাকে ত্যাগ করতে প্রস্তুত হয়। রোজার সময় সে সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি দান করেছিল; এখন সে চেষ্টা করে অন্যকে তার ন্যায্য অধিকারের চেয়েও বেশি দিতে।

রোজার সময় সে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করেছিল; এখন সে জীবনের বাস্তব ক্ষেত্রেও উচ্চতর উদ্দেশ্য নিয়ে সক্রিয় হয়। রোজার সময় সে নিজের কামনা-বাসনাকে সংযত করেছিল; এখন জীবনের বাস্তবতায় সে নিজের অধিকারের চেয়ে দায়িত্বের দিকেই বেশি মনোযোগী হয়।

রোজা ছিল বছরের এক মাসের ব্যাপার, আর ঈদ বাকি এগারো মাসের জীবনের প্রতীক। রোজায় ছিল ধৈর্য, ইবাদত, কোরআন তেলাওয়াত ও আল্লাহর জিকির; আর ঈদের পর শুরু হয় জীবনের সংগ্রামের নতুন অধ্যায়। রোজা যদি ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিজেকে গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ হয়, তবে ঈদ সামাজিক জীবনে সক্রিয় অংশগ্রহণের সূচনা।

রোজা ছিল নিজেকে আল্লাহর নুরে আলোকিত করার সময়, আর ঈদ যেন সেই নুর পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ। রোজা ছিল রাতের নিভৃত সাধনা, আর ঈদ হলো দিনের কর্মব্যস্ততার দিকে সুস্থ অগ্রযাত্রা।

রোজা যেমন কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণার নাম নয়, তেমনই ঈদও কেবল আনন্দ-উৎসবের নাম নয়। উভয়ের বাহ্যিক রূপের আড়ালে গভীর তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে। রোজা সাময়িকভাবে বস্তুজগত থেকে দূরে থাকার অনুশীলন, আর ঈদ সেই জগতে নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে আসা। রোজা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রচেষ্টা, আর ঈদ সেই প্রচেষ্টার পর নতুন ও উন্নততর জীবনের শুভ উদ্বোধন।

তাই, ঈদ মূলত নতুন জীবন শুরু করার দিন। ঈদের বার্তা হলো—মুসলমানরা যেন নতুন ঈমানি শক্তি ও নতুন সম্ভাবনার আলোকে আবার জীবনসংগ্রামে প্রবেশ করে। তাদের অন্তর আল্লাহর নুরে আলোকময় হোক, তাদের মসজিদ আল্লাহর স্মরণে ভরে উঠুক, তাদের ঘর বিনয় ও সৌজন্যের কেন্দ্র হয়ে উঠুক। সব মুসলমান ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুনিয়াতে আল্লাহর সাহায্য এবং পরকালে জান্নাত লাভের চেষ্টা- সংগ্রাম শুরু করুক।

তর্জমা: মওলবি আশরাফ

ওএফএফ