দেশজুড়ে

খাবার সংকটে বানর, বসতবাড়িতে দিচ্ছে হানা

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই আগমন। কখনো দলবেঁধে হানা দিচ্ছে বসতবাড়িতে। আবার কখনো দলছুট হয়ে মানুষের হাত থেকে কেড়ে নিচ্ছে খাবার। তাদের এই আচরণ শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে।

ক্ষুধার জ্বালায় খাবারের খোঁজে এভাবেই বেশ কয়েক বছর ধরে গ্রামবাসীর বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছে বানরের দল। কোনো উপায় না দেখে তারাও মানিয়ে নিয়েছেন বানরের এই আচরণ। সামর্থ্য অনুযায়ী দেন খাবার। তবে প্রাণীগুলোকে সরকারিভাবে খাবার সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শরীয়তপুরের নড়িয়া ও পাশের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ডিংগামানিক কার্তিকপুরের পালপাড়া, মধুপুর ও পাচালিয়া এলাকায় অন্তত ছয় হাজারের বানরের বাস। এ এলাকাগুলোতে প্রাকৃতিকভাবে গাছপালা বেশি থাকায় দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে বানরের দলগুলো তাদের নিবাস গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন গাছপালা ও পুরোনো ভবনের আশপাশে এরা বসবাস করে। একসময় এসব এলাকায় প্রচুর পরিমাণে ফলদ বৃক্ষ ছিল। এসব গাছের ফল খেয়েই বানরগুলো জীবনধারণ করে আসছিল। তবে কয়েক বছর ধরে ফলদ গাছের চাইতে তূলনামূলকভাবে বনজ গাছের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানুষের আবাসস্থল বৃদ্ধিসহ নানা কারণে গাছপালাও উজার হচ্ছে। আগের চাইতে ফল গাছে ফলনের সংখ্যা কমে গেছে। এতে বানরের খাদ্য সংকট তীব্র আকারে ধারণ করেছে। ফলে পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে বানরগুলো প্রায়ই মানুষের বাসাবাড়িতে হানা দিচ্ছে। বাড়ির উঠানে শুকাতে দেওয়া খাবার, রান্নাঘর রাখা খাবার এমনকি শিশুদের হাতে থাকা খাবারও কেড়ে খেয়ে নিচ্ছে তারা।

মানুষেরা বানরের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে সবসময় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে বাদ্য হচ্ছেন। তবে অবলা এসব প্রাণীদের কথা চিন্তা করে কেউ কেউ খাবার দিলেও তা যৎসামান্য। এতে করে এ অঞ্চলটি থেকে বিলীন হওয়ার পথে বানর।

সম্প্রতি কার্তিকপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মানুষের খুব কাছে বিভিন্ন গাছপালা ও ঘরের চালায় বসে আছে বানরের দল। সুযোগ পেলেই দরজা ও জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। কিছু কিছু বানর আবার খাবারের খোঁজে বিভিন্ন ঝোপঝাড়ে খোঁজাখুঁজি করছে। কিছু কিছু বাড়িতে মানুষকে এসব বানরদের কলা ও মুড়ি দিতে দেখা যায়।

কার্তিকপুর পালপাড়া এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বাসুদেব পাল বলেন, ‘প্রথম প্রথম বানরের অত্যাচার খুব খারাপ লাগতো। ওরা ঘরে ঢুকে মালামাল তছনছ করে ফেলতো। চাল, ডাল সব ফেলে দিতো। তখন আমরা ওদের ভয় দেখাতে লাঠি নিয়ে তাড়া করতাম। তবে ওরাও যে অবলা প্রাণী, ওদেরও ক্ষুধার কষ্ট আছে। এখন যতটুকু পারি খাবার দেই।’

একই এলাকার সন্দীপ দাস বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমাদের সঙ্গে বানরের বসবাস। আগে এলাকায় অনেক আম, জাম, কাঁঠাল, কলাগাছ ছিল। সেগুলো থেকে ওরা খাবার খেতো। তবে এখন আর আগের মতো ফল না হওয়ায় ওদের খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে। ওরা এখন আমাদের বাড়িঘরে খাবারের জন্য ঢুকে পড়ে। আমাদের বাচ্চাদের হাত থেকে খাবার ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আমরা যেই খাবার দেই তা সামান্য। আমরা চাই সরকারিভাবে বানরগুলোর খাবার দেওয়া হোক।’

স্থানীয় দোকানদার মীর হোসেন সরদার বলেন, ‘আমাদের পাশাপাশি কয়েকটি এলাকায় অন্তত পাঁচ হাজার বানর বসবাস করে। কমপক্ষে ৫০ বছর ধরে বানরগুলো এলাকাগুলোতে থাকছে। তবে প্রশাসন থেকে এখন পর্যন্ত কেউ বানরের খবর নেয়নি। আমরা এলাকাবাসী খাবার দেই। যখন খাবারের সংকট তীব্র হয়, তখন বানরগুলো আমাদের বাড়িঘর, দোকানপাটে ঢুকে পড়ে। সরকারিভাবে বানরের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা গেলে ওদের ক্ষুধার জ্বালা কিছুটা মিটতো।’

এ বিষয়ে জেলা বন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘শরীয়তপুরের দুটি উপজেলায় বানরের অবস্থান রয়েছে বলে আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবো।’

জানতে চাইলে নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, দিন দিন জনবসতি বেড়ে যাওয়ায় বানরের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এসব কারণে বানরগুলো অনেক সময় বাসাবাড়িতে হানা দেয়।

তিনি বলেন, বানরগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য উপজেলা প্রশাসন থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বানরগুলো যেন ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট না পায়, সেজন্য আমরা তাদের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেবো। প্রয়োজনে বানরের নিরাপদ আবাসস্থল তৈরির জন্য কোনো খাসজমিতে বনায়ন তৈরির মাধ্যমে তাদেরকে সেখানে পুনর্বাসন করবো।

বিধান মজুমদার অনি/এসআর/এএসএম