ঈদ মানেই আনন্দ। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো। সেই আনন্দ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় নতুন পোশাক। কিন্তু এই আনন্দের পেছনে যে মানুষগুলোর নিরলস পরিশ্রম লুকিয়ে থাকে, তাদের কথা খুব কমই সামনে আসে।
ঈদের দিন ভোরে সবাই যেখানে ফুরফুরে মেজাজে ঘুম থেকে ওঠে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নেন, ঠিক তখনো ঘুম ঘুম চোখে বাড়ি ফেরেন তারা। বলছিলাম বিভিন্ন শপিংমল ও কাপড়ের শো-রুমে কর্মরত বিক্রয়কর্মীদের (সেলসম্যান) কথা। জীবনযুদ্ধে ঈদ আনন্দ যেন তাদের কাছে ভিন্ন এক বাস্তবতা।
বিশেষ করে মৌসুমি বিক্রয়কর্মীদের ঈদ আনন্দ নেই বললেই চলে। পুরো রমজানে দিনরাত পরিশ্রম করে ঈদের দিন পুরোদমে বিশ্রামে কাটান তারা।
রমজান মাস শুরু হতেই শপিংমল ও নামিদামি ব্র্যান্ডের কাপড়ের শো-রুমগুলোতে বাড়তি কর্মীর চাহিদা তৈরি হয়। দোকানমালিকরা নিয়োগ দেন অস্থায়ী বিক্রয়কর্মী। সকাল থেকে গভীর রাত, কখনো কখনো সেহরির আগ পর্যন্ত চলতে থাকে তাদের কাজ। ক্রেতাদের ভিড় সামলানো, পণ্য দেখানো, হিসাব রাখা—সব মিলিয়ে একটানা পরিশ্রমে কাটে পুরো মাস।
বিশেষ করে চাঁদ রাতে ব্যস্ততা চরমে পৌঁছায়। অন্যরা যখন পরিবারের সঙ্গে ঈদের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন এই কর্মীরা দোকানেই কাটান সারারাত। অনেকেই ভোরের আগে দোকান ছাড়তে পারেন না। ফলে ঈদের দিন সূর্য ওঠার সময়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফেরেন তারা।
সিলেট নগরীর দরগাহ এলাকার এপেক্স শোরুমে কাজ করা বিক্রয়কর্মী আকিমুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঈদে সবার ছুটি আছে কিন্তু আমাদের ছুটি শুরু হয় ঈদের দিন ভোরে। আমাদের ঈদের কেনাকাটা করা হয় না। কাপড় যে কিনমু সেই সময়টাই পাই না। ক্রেতাদের আমরা সময় দেই।’
তিনি বলেন, প্রতি ঈদের নামাজ পড়ে বাড়িতে যাই। বিক্রয়কর্মীর চাকরি করার কারণে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়া হয় না।
জিন্দাবাজার এলাকার একটি ব্র্যান্ডের দোকানে কাজ করেন হবিগঞ্জের রিফাত হাসান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঈদের দিনই বাড়িতে যেতে হয়। কারণ চাঁদরাতেও আমাদের ছুটি হয় না। এত পরিমাণ মানুষ কেনাকাটা করতে আসে যে, আমরা চাইলেও ছুটি নিতে পারি না।’
তিনি বলেন, ‘সবাই চায় ঈদের দিনটা পরিবারের সঙ্গে কাটাতে। কিন্তু অনেকের কপালে সেটা হয়ে ওঠে না। আল্লাহ চাইলে ঈদের দিন সকালে নামাজ পড়ে বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দেবো।’
সিলেট নগরীর ওয়ান উম্মা বিডি শোরুমের এক বিক্রয়কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চাঁদ রাত পর্যন্ত আমরা দোকানেই থাকি। ঈদের দিন ভোরে বাসায় ফিরি। তখন এত ক্লান্ত থাকি যে ঠিকমতো নামাজ পড়তেও কষ্ট হয়।’
নারী বিক্রয়কর্মীদের পরিস্থিতি আরও ভিন্ন। দীর্ঘ এক মাসের টানা পরিশ্রমে ঈদের দিনটিই তাদের কাছে হয়ে ওঠে বিশ্রামের সময়। অনেকে সারাদিন ঘুমিয়েই কাটান। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ খুবই সীমিত থাকে।
নগরীর কাপড়ের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান মাহা’র একজন নারী বিক্রয়কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রমজান মাসে ঘুমই ঠিকমতো হয় না। তাই ঈদের দিনটা শুধু ঘুমিয়ে কাটাই। এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিশ্রাম।’
কথা হয় বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব এবং সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নগরীর বিভিন্ন শপিংমল ও কাপড়ের শোরুমে অন্তত ৪০ হাজার বিক্রয়কর্মী রয়েছেন। প্রতিবছর রোজার ঈদের আরও অন্তত ৬-৭ হাজার মৌসুমি বিক্রয়কর্মী থাকেন। তাদের কষ্টের শেষ নেই। এজন্য আমরা তাদেরকে বেতনের সমপরিমাণ বোনাস দিয়ে থাকি।’
তিনি আরও বলেন, বিক্রয়কর্মীরা পুরো রমজান মাস পরিশ্রম করায় ঈদের দিনসহ টানা তিনদিন ছুটি বা দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাইরের কিছু কাপড়ের শোরুম ঈদের পরদিনও খোলা রাখে। সিলেটের স্থানীয় কোনো ব্যবসায়ী ঈদের তিনদিন দোকানপাট খোলা রাখেন না।
এসআর/এএসএম