কৃষি ও প্রকৃতি

লিচু ফুলের মধু সংগ্রহে মঙ্গলবাড়ীয়ায় মৌ খামারিদের ব্যস্ততা

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলবাড়ীয়া গ্রামে এখন প্রকৃতির এক ভিন্ন রূপ। গাছে গাছে লিচুর ফুল আর মুকুল, চারদিকে মৌমাছির গুঞ্জন। এই ফুলকে ঘিরেই জমে উঠেছে মধু সংগ্রহের মৌসুম। লিচুবাগানের পাশে সারি সারি মৌবাক্স বসিয়ে খাঁটি মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মৌ খামারিরা। এতে একদিকে যেমন মধু উৎপাদন হচ্ছে, অন্যদিকে মৌমাছির পরাগায়নের কারণে বাড়ছে লিচুর ফলনও।

লিচুর গ্রাম মঙ্গলবাড়ীয়া:

পাকুন্দিয়া উপজেলার মঙ্গলবাড়ীয়া গ্রামটি দীর্ঘদিন ধরে ‘লিচুর গ্রাম’ নামে পরিচিত। গ্রামের রাস্তার দুই পাশ থেকে শুরু করে বাড়ির আঙিনা, মাঠের ধারে সব জায়গায়ই চোখে পড়ে সারি সারি লিচু গাছ। বছরের এই সময়টাতে পুরো গ্রাম যেন ফুলের সুবাসে ভরে ওঠে।

এখন গাছে গাছে ফুটেছে লিচু ফুল। সেই ফুলের পরাগ থেকে মধু সংগ্রহ করতে হাজার হাজার মৌমাছি উড়ে বেড়াচ্ছে বাগানজুড়ে। ফলে পুরো এলাকায় এক ধরনের প্রাকৃতিক সুর ও ব্যস্ততার আবহ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুনবেশি ফল পেতে আম গাছের পরিচর্যায় যা করবেনদিনাজপুরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি সূর্যমুখীর চাষ

লিচুর ফুলকে ঘিরে মধু সংগ্রহ:

লিচুবাগানের পাশে কাঠের বাক্স বসিয়ে মৌমাছি পালন করছেন মৌ খামারিরা। মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে বাক্সে জমা করে, পরে সেখান থেকে খাঁটি মধু সংগ্রহ করা হয়। লিচু ফুলের মধু স্বাদ ও গন্ধে আলাদা হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও বেশি।

মৌ খামারি মোসলেউর রহমান সওমিক জানান, লিচু ফুলের সময় মধু সংগ্রহের জন্য সবচেয়ে ভালো মৌসুম। এই সময় মৌমাছি প্রচুর ফুল পায়, ফলে মধু উৎপাদনও ভালো হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা বাগানের পাশে মৌবাক্স বসাই, মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। এতে ভালো মানের খাঁটি মধু পাওয়া যায়। বর্তমানে এই মধু প্রতি কেজি প্রায় ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।’

আরেক মৌ খামারি সফির উদ্দিন জানান, ‘লিচু ফুলের সময়টাই আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে মৌমাছি বেশি মধু সংগ্রহ করে, ফলে উৎপাদন ভালো হয়। এটা আমার নিজের এলাকা প্রতি বছরই আমি মৌবাক্স বসাই, কারণ আমাদের এখানকার লিচুর ফুল থেকে ভালো মানের মধু পাওয়া যায়। খরচের তুলনায় লাভও সন্তোষজনক, তাই প্রতিবছর এই মৌসুমে মঙ্গলবাড়ীয়ায় লিচু ফুলের মধু সংগ্রহ করি।’

মধু ক্রেতা নাজমুল হক জানান, ‘লিচু ফুলের মধু স্বাদে ও ঘ্রাণে অন্যরকম। এই মৌসুমে আমরা সরাসরি খামারিদের কাছ থেকে মধু কিনতে মঙ্গলবাড়ীয়ায় আসি। এখানে ভেজালের ভয় কম, তাই পরিবারের জন্য নিশ্চিন্তে নেওয়া যায়।’

আরেক ক্রেতা নাজমা আক্তার বলেন, ‘শিশুদের জন্য খাঁটি মধু খুব উপকারী, তাই আমি চেষ্টা করি এই মৌসুমে ভালো মানের মধু সংগ্রহ করতে। মঙ্গলবাড়ীয়ায় লিচু এবং মধুর দুইটাই রয়েছে। তাই এখান থেকে কিনতে আসি। দাম একটু বেশি হলেও গুণগত মান ভালো হওয়ায় সন্তুষ্ট।’

মৌমাছি বাড়াচ্ছে লিচুর ফলন:

মৌমাছি শুধু মধু উৎপাদনেই নয়, লিচু চাষেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মৌমাছি ফুলে পরাগায়ন ঘটানোর মাধ্যমে লিচুর ফলন বাড়াতে সহায়তা করে। তাই অনেক বাগান মালিকই মৌ খামারিদের বাগানের পাশে মৌবাক্স বসাতে উৎসাহিত করেন।

স্থানীয় বাগান মালিকরা জানান, যেখানে মৌমাছির আনাগোনা বেশি থাকে, সেখানে লিচুর ফলনও তুলনামূলক ভালো হয়। ফলে লিচু চাষি ও মৌ খামারি দুই পক্ষই লাভবান হচ্ছেন।

হাজার হাজার লিচু গাছের গ্রাম:

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবাড়ীয়া গ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার লিচু গাছ রয়েছে। লিচু চাষ এই গ্রামের মানুষের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস। মৌসুম এলে অনেক পরিবার লিচু বিক্রির টাকায় সারা বছরের খরচ মেটায়।

মৌ খামারিরা বলছেন, লিচুর মৌসুমকে ঘিরে এখানে মধু সংগ্রহের ভালো সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই বিভিন্ন এলাকা থেকেও অনেক খামারি এসে এই সময় বাগানের পাশে মৌবাক্স বসান।

আরও পড়ুনজয়পুরহাটে স্ট্রবেরি চাষে কৃষকের বিঘায় লাভ আড়াই লাখ৩৫৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ, ঝুঁকির মুখে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ

কৃষি বিভাগের তদারকি ও পরামর্শ:

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কিশোরগঞ্জের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, লিচু ফুলের সময় মৌমাছির উপস্থিতি ফলনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৌমাছি ফুলে পরাগায়ন ঘটানোর মাধ্যমে ফল ধরতে সাহায্য করে এবং ফলন বাড়ায়।

তিনি আরও বলেন, লিচু গাছকে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা এবং ভালো ফলন নিশ্চিত করতে কৃষি বিভাগ নিয়মিত বাগান মালিকদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।

সামনে লিচুর মৌসুম:

এ বছর গাছে প্রচুর মুকুল আসায় বাগান মালিকরা বাম্পার ফলনের আশা করছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আর দুই মাস পরই বাজারে উঠবে মঙ্গলবাড়িয়ার সুস্বাদু লিচু।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি মৌসুমে এই এলাকা থেকে প্রায় ৬ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। লিচু আর মধু এই দুইয়ের সমন্বয়ে মঙ্গলবাড়িয়া এখন গ্রামীণ অর্থনীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

কেআরএম/এমআইএইচ